শ্রীধর দত্ত
একসময় নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড়, পুকুর-ডোবায় প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। শহরের অনেক জলাশয় হারিয়ে গেছে। বর্তমানে বড় বড় নদীর দুই পাড় ভূমিদস্যুদের দখলে! গ্রামগঞ্জের নদীগুলোও একই পরিস্থিতির শিকার হয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে। ছেলেবেলায় দেখেছি পুকুরে জাল দিত কিন্তু সেচ মেশিন দিয়ে সম্পূূর্ণ পানি নিষ্কাশন করা হতো না। এখন আর সেই অবস্থা নেই।
তথ্য সূত্রমতে দেশে ২৬০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ আছে; এর মধ্যে ৬৪টি প্রজাতি এখন প্রায় বিলুপ্ত, ২৮ প্রজাতির মাছ চরম বিপন্ন এবং ১৪ প্রজাতির মাছ সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। বড় মাছের মধ্যে রুই, কাতলা, পাঙ্গাশ, বোয়াল, মৃগেল, আইড়, চিতল, শোল, গজার, বাঘাইর মাছ চাষ হচ্ছে। বিদেশ থেকে আসা জাতগুলোর মধ্যে আছে সিলভারকার্প, গোল্ডকার্প, মিররকার্প, গ্লাসকার্প, বিগহেড, নাইলোটিকা, থাই কৈ, ভিয়েতনামি কৈ, তেলাপুয়ে, ব্লাককার্প, কমনকার্প। মাছগুলো বদ্ধ জলাশয়ে অল্পসময়ে অধিক উত্পাদনের জন্য কৃত্রিম ও রাসায়নিক খাবার দেওয়া হয়। তবে মিঠা পানির মাছ সরপুঁটি, কৈ, গুজি, বাইন, পুঁটি, গোলসা, বউ, চেলা, বেলে, পাবদা, শিং, মাগুর, বেদামাছ, ট্যাংরা, খোকশা, কালাবাটা, ঢেলা, মওয়া, লটা, শোল, বাইন, চান্দা, তিলপুঁটি, ফলই, কালবাউশ, গুইজা, কৈয়া পাতি, একঠোটা ঘাউরা ইত্যাদি মাছের অনেক জাত এখন আর নেই। তবে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, পুকুর-ডোবায় এখন সেচ মেশিন দিয়ে তলা পর্যন্ত পরিষ্কার করে মাছের পোনা পর্যন্ত নষ্ট করা হচ্ছে। যেটুকু মাছ বেঁচে থাকে তাও আবার ধরা হচ্ছে ভাসা জাল (কারেন্ট জাল) দিয়ে। মিঠা পানির মাছের প্রজননের মৌসুমে নদ-নদীতে ছোট ছোট পোনা মাছ বেশি থাকে। ফলে জেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাধারণ মানুষও ছোট ছিদ্রওয়ালা কারেন্ট জাল দিয়ে পোনা মাছ ধরে ফেলে। বর্ষা মৌসুমই মাছের ডিম পাড়া ও বংশবিস্তারের সময়। পোনা মাছগুলো বড় হওয়ার সুযোগ পেলে মিঠা পানির মাছের চাহিদা অনেকাংশে লাঘব হতো ও মাছের সংখ্যাও বাড়ত। আমাদের অসচেতনতার কারণে আমরা মিঠা পানির মাছগুলো হারাচ্ছি। আগে মাছ ছিল সুস্বাদু, বর্তমানে কৃত্রিম খাদ্যের কারণে মাছের স্বাদ হারিয়ে গেছে।
মিঠা পানির মাছ রক্ষার জন্য ভাসা জাল বিক্রি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। নদ-নদী, হাওড়-বাঁওড়, খাল-বিল, পুকুর ও মুক্ত জলাশয়ে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ়—এই তিন মাস মিঠা পানির মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা উচিত। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই। আগে আমরা যে মাছগুলো খেয়েছি বর্তমান প্রজন্ম সে মাছগুলো পায়নি। বর্তমান যে মাছগুলো আছে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম সে মাছগুলো পাবে কি না সন্দেহ। জনসচেতনতা ও সরকারের সুষ্ঠু পদক্ষেপই পারে মিঠা পানির মাছ রক্ষা করতে।
আমাদের জীবনে মত্স্যপ্রীতি যে জড়িয়ে রয়েছে তা না বললেই নয়। মাছ নিয়ে আছে প্রবাদ-প্রবচন ও বাগ্ধারা। যেমন ‘রাঘব বোয়াল’, ‘গভীর জলের মাছ’, ‘মাছের মা’, ‘মাছের তেলে মাছ ভাজা’, ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’, ‘ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না’, ‘মাছের মায়ের পুত্রশোক’ ইত্যাদি। বাঙালি সংস্কৃতিতে বিয়েবাড়িতে কিংবা গায়ে হলুদে রুই মাছ সাজিয়ে পাঠানো মঙ্গলের প্রতীক।
বাঙালির সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হলো মাছ। মাছ আমাদের জীবন, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাই ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য মাছের বংশ সংরক্ষণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
চট্টগ্রাম
