অণুগল্প

যদি

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:২২

সারওয়ার-উল-ইসলাম

 

মহসিন হলের সামনের মাঠটায় গল্প করছি বান্ধবীদের সঙ্গে। সকাল আটটা থেকে বেলা এগারোটা পর্যন্ত ক্লাস হয়েছে। এখন তিন ঘণ্টার গ্যাপ। আবার দুটো থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ক্লাস চলবে। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশাখী বাসে চড়ে মিরপুর ১৩ নম্বর হারম্যান মাইনার স্কুলের সামনে নামব।

রোদের তেজ তেমন একটা নেই। গল্প চলছে ধুমসে। ক্লাসের একটা ব্যাক্কল ছেলেকে নিয়ে আলাপ চলছে বান্ধবীদের ভেতর। কেমন করে গায়েপড়ে ওদের সঙ্গে কথা বলে, সেটাই হচ্ছে আলোচনার মূল বিষয়। ঠিক এমন সময় পেছন থেকে আমার দুচোখে কেউ একজন হাত রেখে চোখ ঢেকে দিল। অপ্রস্তুত হলাম। বান্ধবীদের কথা বন্ধ হয়ে গেল। চোখ ঢাকা থাকায় ওদের অভিব্যক্তি টের পেলাম না।

কে হতে পারে? ভাবতে থাকি। অনুভব করছি হাত দুটো কোনো মেয়েমানুষের। কোমল। কিন্তু কে? কিছুতেই মাথায় আসছে না। ছেমড়ি না তো? ভাবলাম। চুড়ির শব্দ পেলাম। চুড়ি পরা যার শখ। আরে ছেমড়ি-ই তো। ছেমড়ি বলেই ডাকি ভালোবেসে। কথাটা মনে হতেই নিজের দু’হাত দিয়ে পেছন থেকে চোখে রাখা হাত দুটো সরিয়ে দেখলাম, যাকে ভেবেছি  সে-ই।

প্রথমে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম। পড়াশোনা করছি প্রায় দু বছর হতে চলল। কোনোদিন এই ছেমড়ির কথা বলা হয়নি বান্ধবীদের। আমার সঙ্গে কোনো মেয়ের সম্পর্ক আছে—এটা বেমালুম চেপে গেছি। যা হোক, ছেমড়ির আসল নাম বলে, পরিচয় করিয়ে দিয়ে, কোথায় পড়ে, কতদিনের সম্পর্ক—সব বলে ওকে নিয়ে বিদায় হই। আচমকা ছেমড়ির উদয় হওয়ায় বান্ধবীদের মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। টাশকি খেয়ে গেল সবাই।

সবাইকে অবাক করে দিয়ে ক্লাসের কথা ভুলে মহসিন হলের মাঠ থেকে হাঁটতে হাঁটতে নীলক্ষেতের দিকে চলে আসি। আসতে আসতে বলি, ‘তুই এভাবে চমকে দিলি কেন? ওরা আমাকে পরে এক হাত নেবে।’

আমার কথা শুনে ছেমড়ি বলল, ‘আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই করলাম। আমার নিজের অবস্থানটা জানান দিয়ে রাখলাম, যাতে কেউ এগিয়ে না আসে তোমার দিকে।’ বলেই হাসল। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাসিটা দেখলাম।

ঠিক আছে, কী খাবি? বললাম।

কী আবার চাঁদনি চকের ফুচকা আর লাচ্ছা।—বলেই ছেমড়ি আমার বাঁ হাতের কনুইয়ের কাছে নিজের ডান হাতটা ঢুকিয়ে কিছুটা ঘনিষ্ট হলো। আমি একবার ওর মুখের দিকে তাকালাম। ও তাকাল। কিছু বলল না। শুধু মিটমিট করে হাসল। আমিও হাসছি ওর মতোই।

একটু পরে ওর ভুবনভোলানো হাসিটা দিল।

২.

সেই হাসির শব্দ শুনি না আর এখন! একঘরে থাকা হয়নি আমাদের। থাকা হলে পরে আমিও সকালে ঘুম থেকে উঠতাম আমার ছেমড়ির দুষ্টুমির উপকরণ হয়ে। বৃষ্টির পরে কোনো কোনো ছুটির দিনের বিকেলটা কাটত ছেমড়ির সঙ্গে রিকশায় ঘুরে বেরিয়ে। কিংবা জোছনারাতে ছেমড়ির হাতের ছোঁয়ায় চোখের পাতায় ঘুম নেমে আসত।

যদি ছেমড়ি আমার হতো! তাহলে জীবনটা তো অন্যরকম হতেও পারত।

একটা শব্দ—‘যদি’। এর কত ক্ষমতা!

যদি হতো? তাহলে এমন হতো। অমন হতো। না না এমনও হতো। এভাবেই দুজন বয়ে চলেছি জীবনকে, বুকের পাশের শার্টের বোতাম ভেবে।

যে বোতামটা খুলে পড়েছিল দেখে ছেমড়ি দৌড়ে গিয়ে ঘর থেকে সুই-সুতা এনে লাগিয়ে দিয়েছিল একদিন।