সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ ভবনের দরজা-জানালা ভেঙে পড়ছে
মো. লুত্ফুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি
প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন ‘রাণীর কুঠি’। এটি কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্রে ছোটরা মৌজায় অবস্থিত ধর্মসাগরের উত্তর পাড়ে ত্রিপুরা রাজ বংশের নির্মিত ‘বিশ্রামাগার’। বর্তমানে এটি জরাজীর্ণ ও নড়বড়ে অবস্থায় পড়ে আছে। স্যাঁতসেঁতে মেঝে। সামান্য বৃষ্টিতে টিনের চালার ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ে আসবাবপত্র ভিজে নষ্ট হচ্ছে। ভেঙে পড়ছে দরজা জানালা। ঐতিহাসিক এ নিদর্শন এখন অনেকটা পরিত্যক্ত ও ভূতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। তিনটি প্রতিষ্ঠানের টানাটানিতে এর সংস্কার হচ্ছে না। বাড়িটি সংস্কার করে এখানে একটি ইতিহাস ভিত্তিক জাদুঘর করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, আজ থেকে ৫৬২ বছর আগে ১৪৫৮ সালে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মহারাজা ধর্মমাণিক্য বাহাদুর কুমিল্লা শহরের বাদুরতলা, কান্দিরপাড়, শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়াম ও নগর উদ্যানের মধ্যবর্তী স্থানে ২৩ দশমিক ১৮ একর জায়গা নিয়ে শহরবাসীর পানির সংকট মেটাতে দীঘি খনন করেন। তার নামানুসারে এই দীঘির নাম রাখা হয় ‘ধর্মসাগর’। পরবর্তীতে ধর্মসাগরের উত্তর পাড় ঘেঁষে ১ দশমিক ২৩ একর ভূমির ওপর নির্মাণ করা হয় ‘রাণীর কুঠি’। এটি তদানিন্তন মহারাজা মানিক্য কিশোর বাহাদুরের স্ত্রী বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করতেন। পরে এটি ত্রিপুরা রাজ বংশের ‘বিশ্রামাগার’ হিসেবে ব্যবহূত হয়। তবে প্রমাণ আছে যে, এই বাড়িটি মহারাজা উদয় মানিক্যের নির্দেশে নির্মিত হয়েছিল। জানা যায়, রাণীর কুঠি এবং এর ভূমি কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের অধীনে রয়েছে। বন্দোবস্ত (লিজ) সূত্রে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) এটি ‘অতিথিশালা’ হিসেবে ব্যবহার করছে। এখানে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধান ও দেশি-বিদেশি অতিথিরা বিশ্রাম নিয়েছেন। একসময় এখানে থাকা অতিথিদের মনে ভালো লাগার পরশ বুলিয়ে যেত নির্মল বাতাস। ধর্মসাগরের রাণীর কুঠিরের সামনে শান বাঁধানো ঘাট। বড় গাছের ডালে পাখির কিচির মিচির আওয়াজ অন্যরকম পরিবেশের সৃষ্টি করত। বর্তমানে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় রাণীর কুঠি অতিথিশালা হিসেবেও ব্যবহূত হচ্ছে না। এর কয়েকটি কক্ষ বার্ডের প্রকল্পের অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সরকার রাণীর কুঠিকে নগর জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। এটাকে প্রত্ন নগর জাদুঘর করা হলে জেলার কীর্তিমান ব্যক্তিদের স্মৃতি ও বিভিন্ন বিহার খননের পর প্রাপ্ত প্রত্ন সম্পদগুলো সংরক্ষণ করা হবে। কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রমিজ খান বলেন, ‘দিনে দিনে রাণীর কুঠি পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হচ্ছে। তিন প্রতিষ্ঠানের রশি টানাটানিতে এর সংস্কার হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে এখানে নগর জাদুঘর করার দাবি জানিয়ে আসলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।’ গবেষক গোলাম ফারুক বলেন, ‘রাণীর কুঠি ত্রিপুরার রাজদরবারের শাসকরা নির্মাণ করেছেন। এখানে ইতিহাস ভিত্তিক একটি জাদুঘর স্থাপন করা যেতে পারে।’ বার্ড পরিচালক (প্রশাসন) ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাণীর কুঠিরের ভূমি জেলা প্রশাসনের অধীনে। বিষয়টি এখনো ফয়সালা হয়নি। তাই সংস্কার করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে।’ কুমিল্লায় অবস্থিত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. আতাউর রহমান বলেন, ‘সরকার ২০০৯ সালের ২২ এপ্রিল রাণীর কুঠিকে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ (পুরাকীর্তি) হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু বার্ড এটাকে অতিথিশালা করলেও সংস্কারের অভাবে নষ্ট হচ্ছে। তারা সরে গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জাদুঘর স্থাপনের কাজ শুরু করব। এখানে জাদুঘর স্থাপন করা হলে এই অঞ্চলের বিনোদনে নতুন মাত্রা যোগ হবে।’ কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন, ‘রাণীর কুঠি দেখভাল করছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বার্ড। কিন্তু এর ভূমিটি আমাদের। আমরা ভূমিটি ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য চিন্তা করছি।’
