নারায়ণগঞ্জে মসজিদে এসি বিস্ফোরণ, একজনের মৃত্যু

৫০ মুসল্লি গুরুতর দগ্ধ

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:৪৪

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা বাইতুস সালাম জামে মসজিদে গতকাল শুক্রবার রাতে এশার নামাজ শেষে মোনাজাত চলাকালে এসির ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে অন্তত ৫০ জন মুসল্লি গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে ৪০ জনকে ঢাকার শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। ঢাকায় নেওয়ার পথে মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি হান্নান মারা যান।

বার্ন ইনস্টিটিউটের সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন জানিয়েছেন, ভর্তিকৃত ব্যক্তিদের কেউই শঙ্কামুক্ত নন। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ৩৭ জনকে জরুরি বিভাগে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। জরুরি বিভাগের চিকিত্সকদের সঙ্গে হাসপাতালের অন্য চিকিত্সকরাও দগ্ধদের চিকিত্সায় যোগ দিয়েছেন। ভর্তিকৃতদের সবারই ডিপ বার্ন হয়েছে। শতাংশের হিসেবে কোন রোগীর কতটুকু বার্ন হয়েছে তা তাত্ক্ষণিকভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে প্রাথমিকভাবে বলা যায়, প্রায় সবার শরীরের ৩৫ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত দগ্ধ হয়েছে। কেউই শঙ্কামুক্ত নন।

বিস্ফোরণ নিয়ে স্থানীয় লোকজন জানান, গতকাল রাত পৌনে ৯টার দিকে মসজিদে এশার নামাজ শেষে মোনাজাত চলছিল। এ সময় হঠাত্ বিকট শব্দে মসজিদের ভেতরে থাকা ছয়টি এসি একে একে বিস্ফোরিত হয়। এতে মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জিনসহ মোনাজাতরত প্রায় অর্ধশত মুসল্লি দগ্ধ হন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে দগ্ধ ও আহতদের উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিত্সকগণ কয়েক জনকে চিকিত্সা দেন, বাকিদের অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাদের দ্রুত ঢাকায় পাঠান।

মসজিদ কমিটি সূত্রে জানা গেছে, মসজিদে জেনারেল কোম্পানির ছয়টি এসি ছিল। বিদ্যুতের ভোল্টেজ ওঠানামা করার কারণে এসিগুলোর বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে তারা ধারণা করছেন। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন জানিয়েছেন, এসি বিস্ফোরণের কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, কীভাবে একই সময় ছয়টি এসি বিস্ফোরিত হলো, এটা তদন্তের পর বলা যাবে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ জিল্লুকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ঐ মসজিদে কোনো গ্যাসের লাইন ছিল কি না, সেটাও দেখা হচ্ছে। কারণ, মসজিদের ভেতরে জমে থাকা পানি থেকে বুদবুদ বের হচ্ছে। ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা রয়েছেন।

বিস্ফোরণের খবর পেয়ে রাতেই জেলা প্রশাসক মো: জসিম উদ্দিন ও পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিত্সার তদারকি করেন।

নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. ইমতিয়াজ জানান, অগ্নিদগ্ধ ৩০-৩৫ জনের অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন যে, তাদের দ্রুত ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনসহ ৩৭ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন, মসজিদের ইমাম আবদুল মালেক (৫০), মোয়াজ্জিন দেলোয়ার (৪৫), মুসল্লি মো. ফরিদ (৫৫), শেখ ফরিদ (২১), মনির (৩০), মোস্তফা কামাল (৩৫), রিফাত (১৮), মাইনুউদ্দিন (১২), মো. রাসেল (৩০), রাশেদ (২৭), নয়ন (২৫), বাসার মোল্লা (৩০), বাহাউদ্দিন (২৮), শামীম হাসান (৩০), জোবায়োর (২৯), জয়নাল (৩২), মোহাম্মদ আলী সাব্বির (৩২), মোহাম্মদ আলী (২০), মামুন (২৫), কুদ্দুস বেপারী (৪০), মোহাম্মদ নজরুল (৩৫), সিফাত (২৮), আব্দুল আজিজ (৩৫), নিজাম (৩০), মো. পেনান (২৮), নাদিম হুমায়ুন (৪০), ফাহিম (২৪), জুলহাস (৩০), ইমরান হোসেন (২৮) আব্দুস সাত্তার (২৮), এবং আমজাদ (৩৯)।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জমশের আলী ঝন্টু জানান, হঠাত্ বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পরই আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি ভেতরে একের পর এক লোকজন পড়ে আছে। আহতদের মধ্যে যারা মসজিদ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন তারা বাইরের বিস্ফোরিত  ট্রান্সফরমারের গরম তেলে আবার দগ্ধ হন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ঘটনার পর দগ্ধ রোগীদের নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানকার কোন ডাক্তার তাদের চিকিত্সা দিতে আসেননি। তাদের হাসপাতালের ফ্লোরে বসিয়ে রাখা হয়। পরে দগ্ধদের ঢাকায় পাঠানো হয়।

নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ডাক্তার নাজমুল হোসেন জানান, রাত ৯টা থেকে একের পর এক রোগী আসতে থাকে। তাদের সবার নাম লিপিবদ্ধ করা হয়নি। যেসব রোগী এসেছে তাদের ৭০ থেকে ৭৫ ভাগই গুরুতর দগ্ধ হয়েছে। তাদের দ্রুত প্রাথমিক চিকিত্সা দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু ঘটনাস্থল থেকে জানান, এসি বিস্ফোরণে মসজিদের জানালার সব গ্লাস ভেঙে যায়। ফ্যানের ব্লেডগুলোও বাঁকা হয়ে যায়। মসজিদের ভেতরে ফ্লোরের কিছু স্থানে রক্ত দেখা গেছে। তিনি আরো জানান, ঘটনার পর থেকে এলাকায় বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।