চুরির উদ্দেশ্যে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলা হয়েছে বলে র্যাবকে জানিয়েছেন এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃত যুবলীগ কর্মী আসাদুল হক (৩৫)। তবে এই চুরির মূল পরিকল্পনাকারী পেশায় রংমিস্ত্রি নবীরুল ইসলাম (৩৮)। ইউএনওর বাংলোর সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ থেকে এই দুই জনকে শনাক্ত করেছে র্যাব। তাদের সঙ্গে সান্টু কুমার বিশ্বাস (২৮) নামে আরো এক জনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এই তিন জনকে শুক্রবার ভোরে ঘোড়াঘাট এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় আটককৃত যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলমকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় রংপুর র্যাব -১৩ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অধিনায়ক কমান্ডার রেজা আহমেদ ফেরদৌস।
রেজা আহমেদ ফেরদৌস বলেন, আটক আসাদুলের দাবি, হামলা করেছেন আরেক আসামি নবীরুল ইসলাম। চুরির উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন আসাদুল। তবে কী কারণে হামলা হয়েছে, সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছার সময় এখনো আসেনি। র্যাবের পক্ষ থেকে ছায়া তদন্ত চলছে। এটা অব্যাহত থাকবে। এ ঘটনায় আটক ঘোড়াঘাট থানা যুবলীগের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলমকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ হামলার মোটিভ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে এখন পর্যন্ত আসাদুলের বক্তব্য অনুযায়ী এটি একটি নিছক চুরির ঘটনা।
র্যাব জানায়, নবীরুল ইসলাম পেশায় রংমিস্ত্রি। ঘটনার ২৩ দিন আগে ইউএনওর বাসভবন রং করার কাজ করেন। আসাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘোড়াঘাট থানায় একটি চুরির মামলা রয়েছে। যদিও স্থানীয় সূত্রের দাবি, আসাদুল উপজেলা যুবলীগের এক জন সদস্য। আসাদুল ও নবীরুল এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে টুকিটাকি কাজ করেন। কাজ করতে গিয়ে তারা খুঁজতে থাকেন যে ঐ বাড়ি থেকে চুরির জন্য মূল্যবান জিনিস কী কী আছে। সেই অনুযায়ী তারা পরবর্তী সময়ে পরিকল্পনা নেন। এক সপ্তাহ আগে নবীরুল ইউএনওর বাংলো রেকি করেন। র্যাব সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ থেকে দেখতে পায় যে লাল রঙের টি-শার্ট পরিহিত এক যুবক মই নিয়ে ইউএনওর বাংলোতে প্রবেশ করছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব প্রথমে উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। জাহাঙ্গীর সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ দেখে র্যাবকে বলেন, ইউএনওর বাংলোতে যাদের প্রবেশ করতে দেখা যাচ্ছে, তাদের নাম আসাদুল ও নবীরুল। এরপর র্যাব বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে হিলির কালীগঞ্জ এলাকা থেকে আসাদুল এবং ঘোড়াঘাট উপজেলা সংলগ্ন চক বামনদিয়া বিশ্বনাথপুর গ্রাম থেকে নবীরুলকে গ্রেফতার করে।
র্যাব-১৩-এর অধিনায়ক সংবাদ সম্মেলনে আরো দাবি করেন, হত্যাচেষ্টায় ব্যবহূত হাতুড়ি ও অন্যান্য আলামত দিনাজপুর সিআইডির কাছে জমা রয়েছে। ভিডিও ফুটেজে লাল রঙের টি-শার্ট পরিহিত এক জন প্রবেশকারীকে শনাক্ত করা হয়েছে। সে আসাদুল। ঐ টি-শার্টটিও র্যাব উদ্ধার করেছে।
ইউএনওর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল
আহত ওয়াহিদা খানমের শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল। তিনি কথা বলতে পারছেন। শনিবার তার চিকিত্সার জন্য মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হবে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদকে প্রধান করে সাত সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হবে। ইনস্টিটিউটের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম বলেন, শুক্রবার সকালে ইউএনওর স্বামী আইসিইউতে তাকে দেখতে যান। এসময় ওয়াহিদা খানম হাত ও মাথা নেড়ে জবাব দেন।
ইউএনওর বাবা যা বললেন:
দুর্বৃত্তদের নৃশংস হামলার বিষয়ে মুখ খুলেছেন ইউএনওর আহত বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখ। তিনি জানিয়েছেন, বাসায় ঢুকে হামলাকারীরা টাকা-পয়সা, গয়না কোথায় আছে সেগুলো দিতে বলে। বারবার ওয়াহিদা খানমের কাছে চাবিও চেয়েছে মুখোশধারী হামলাকারীরা। চাবি না দিলে তার চার বছরের সন্তানকে মেরে ফেলার হুমকিও দেয়। তিনি বলেন, বুধবার দিবাগত রাত ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে তাহাজ্জুদ নামাজ পরে কেবল শুয়েছিলাম। ঘুম ঘুম লাগছিল। এমন সময় মেয়ের চিত্কার শুনে ওপর তলায় যাই। মেয়ে তখন আমাকে ডাকছিল আর বলছিল, ঘরে কেউ ঢুকেছে বাবা, দ্রুত আস। আমি ওপর তলায় গিয়ে দেখি মুখোশধারী এক ব্যক্তি মেয়ের কাছে চাবি চাচ্ছিল। টাকা-পয়সা ও গহনা কোথায় তা জানতে চাচ্ছিল বারবার। তথ্য না দিলে আমার নাতিকে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দিচ্ছিল ঐ ব্যক্তি। এক পর্যায়ে আমি তাকে ধরে ফেলি। এ সময় তার সঙ্গে আমার ধস্তাধস্তি শুরু হয়। তখন হাতুড়ি দিয়ে আমার ঘাড়ে আঘাত করলে মেঝেতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যাই। এরপর কি হয়েছে আমি বলতে পারি না।
দুই যুবলীগ নেতা বহিষ্কার : ইউএনওর বাসায় হামলার অভিযোগে ঘোড়াঘাট উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম ও সদস্য আসাদুল হককে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় যুবলীগ। গতকাল শুক্রবার দুপুরে যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় এমপি যা বললেন: ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, জাহাঙ্গীর ও আসাদুলের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে হামলা, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, ভূমি দখল, মাদকসহ বিভিন্ন অসামাজিক কাজের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে পৌর মেয়র আব্দুস সাত্তার মিলনের ওপর হামলা চালায় আসাদুল ও তার সহযোগীরা।
এ প্রসঙ্গে দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. শিবলী সাদিক বলেন, আসাদুলসহ যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় সন্ত্রাস, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া, ভূমি দখলসহ একাধিক মামলা রয়েছে। এজন্য তাদের দল থেকে বহিষ্কারের জন্য কেন্দ্রকে একাধিকবার জানিয়েছি। কিন্তু কেন এতদিন এই দস্যুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, দেশবাসীসহ আমারও প্রশ্ন। আমিও সেটি জানতে চাই।
