মাধব রায়, সহকারী অধ্যাপক
ব্লু বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট
দুপুরের খাবার খেয়ে আনজুম একটু রেস্ট নিচ্ছিলেন। বিছানায় শোয়ার পর একটু যেন ঘুম লেগে গিয়েছিল। হঠাত্ গাড়ির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। তানভীর সাহেব এসেছেন।
কী ব্যাপার ! এতো তাড়াতাড়ি চলে এলে যে ?
আজকের কাজ শেষ, বললেন তানভীর সাহেব।
খেয়েছো ?
হ্যাঁ।
আজকে বৌদি খুব মজার কয়েকটা ভর্তা রান্না করেছেন। না খেলে এর টেস্ট বুঝবে না।
তাই নাকি !
এমন সময় কমলা এলেন— তানভীর ভাই চলে এসেছেন ?
হ্যাঁ বৌদি, আজকের কাজ শেষ।
ভাত খেয়েছেন ? না খেলে খেয়ে নিন, ভর্তা আর পাবদা মাছ।
না না, আমি মাত্র খেয়ে এলাম।
তাহলে চা দিই ?
দিতে পারেন।
তানভীর সাহেবের গলা শুনে বাচ্চা-কাচ্চারা চলে এসেছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন— তোমরা কিসের গল্প শুনছিলে ?
আমরা প্রথমে গল্প শুনলাম স্যাটেলাইটের, এর পরে প্রসারণ সহগের বলল অণু।
আকাশ জিজ্ঞেস করল— মানুষ কবে থেকে মহাকাশ যাত্রা শুরু করল আঙ্কেল ?
তানভীর সাহেব বললেন— বেশি দিন আগে থেকে নয়। এই তো সেদিন 1957 সালের 4 অক্টোবর। তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন স্পুটনিক-1 নামে কৃত্রিম উপগ্রহ আকাশে উেক্ষপণ করে।
স্পুটনিক মানে কী ? বলল রেখা।
স্পুটনিক হলো Fellow travellers বা ভ্রমণসঙ্গী, বললেন তানভীর সাহেব। এটি পাঠানো হয়েছিল আন্তর্জাতিক ভূগোলবর্ষে। স্পুটনিকের নকশা করেন সের্গেই করালিওভ নামের এক ইউক্রেনিয় ইঞ্জিনিয়ার। এরপর একই বছর 3 নভেম্বর স্পুটনিক-2 নামের আরেকটি মহাকাশযান পাঠায় রাশিয়া। এতে মহাকাশযাত্রী প্রথম প্রাণী হিসেবে লাইকা নামের একটি কুকুর ছিল।
কুকুর কেন পাঠাল আঙ্কেল ? বলল বিন্দু। মহাকাশযাত্রী হিসেবে কুকুর এর কথা শুনে সে আনন্দ পেয়েছে।
কুকুর পাঠানোর উদ্দেশ্য ছিল মহাকাশে প্রাণীদেহে কিরূপ প্রভাব পড়ে এটি অনুধাবন করা। তবে তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে উেক্ষপণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাইকা মারা যায়।
আহা রে ! বলল সীমা। বেচারা মানুষের গবেষণার জন্য প্রাণ দিলো।
হ্যাঁ, লাইকা মানুষের জন্য প্রাণ দেয় এবং এর ওপর পরীক্ষণের তথ্য মহাশূন্যে মানুষ প্রেরণে উত্সাহিত করে।
আমেরিকা মহাশূন্যে স্যাটেলাইট পাঠায়নি ? প্রশ্ন রেখার।
হ্যাঁ, আমেরিকা 1945 সালে পরিকল্পনা শুরু করলেও 1958 সালের 31 জানুয়ারি এক্সপ্লোরার—1 নামে একটি স্যাটেলাইট উেক্ষপণ করতে সক্ষম হয়। মহাশূন্যে পাঠানো প্রথম যোগাযোগ উপগ্রহ স্কোর 1958 সালের 18 ডিসেম্বর পাঠানো হয়। 1959 সালের 4 অক্টোবর পাঠানো হয় লুনা— 3, এটি হলো প্রথম উপগ্রহ, যা চাঁদের অদৃশ্যমান অংশের ছবি পাঠায়।
অণু বলল— তাহলে মানুষ কখন মহাশূন্যে ভ্রমণ করে আঙ্কেল ?
হ্যাঁ, বলছি— বললেন তানভীর সাহেব। 1961 সালের 12 এপ্রিল ভোস্টক—1 এ চড়ে ইউরি আলেকশেইভিচ গ্যাগারিন মহাশূন্যে ভ্রমণ করেন। তিনিই প্রথম নভোচারী মানুষ।
তাহলে তো তিনি ইতিহাসের একজন বিখ্যাত ব্যাক্তি —বলল চন্দ্রা।
অবশ্যই, এই ব্যক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের জাতীয় নায়কে পরিণত হন। মহাকাশচারী হিসেবে তাঁকে বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটাও মজার। বিভিন্ন অনুসন্ধান ও বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রাথমিকভাবে 20 জনকে নির্বাচিত করা হয়। এরপর কর্মদক্ষতা ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণে গ্যাগারিনকেই চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়।
শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণে কেন ? বলল বিন্দু।
গ্যাগারিন ছিলেন 5 ফুট 2 ইঞ্চি উচ্চতার এবং ভোস্টকের ককপিট তাঁর জন্য উপযুক্ত ছিল। প্রথম মহাকাশচারী হিসেবে চূড়ান্ত বাছাইয়ে 20 জন প্রার্থীকে একে অন্য প্রার্থীর জন্য ভোট দিতে বলায় তিনজন ছাড়া বাকি সবাই গ্যাগারিনকে পছন্দ করেছিলেন।
অণু বলল— গ্যাগারিন কত উঁচুতে উঠে পৃথিবী ভ্রমণ করেছিলেন ?
177 কিলোমিটার। বললেন তানভীর সাহেব। 108 মিনিট মাহাকাশে থেকে তিনি নিরাপদে অবতরণ করেন।
ইতোমধ্যে কমলা চা আর চানাচুর নিয়ে এসেছেন। তিনি বললেন— মহাকাশে নারী নভোচারী যায়নি ?
অবশ্যই, বললেন তানভীর সাহেব। ভ্যালেন্তিনা ভ্লাদিমিরোভনা তেরেশকোভা হলেন প্রথম নারী মহাকাশচারী যিনি ভোস্টক—6এ করে 12 এপ্রিল 1961 সালে মহাকাশ ভ্রমণ করেন।
তিনিও সোভিয়েত ইউনিয়নের ?
হ্যাঁ, তিনিও সোভিয়েত ইউনিয়নের। তিনি সোভিয়েত বিমান বাহিনীর মেজর পদমর্যাদার পাইলট ছিলেন। মহাকাশে তিনি 2 দিন 23 ঘণ্টা 12 মিনিট অবস্থান করে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন। এই সময়ে তিনি 48 বার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে ফেলেন।
এতোবার ! অবাক হলো সবাই।
হ্যাঁ, এতোবার। এরপর 16 নভেম্বর 1965 সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেনেরা—3 কে শুক্রগ্রহে অবতরণ করায়। এর আগে শুক্রে আর কেউ মহাকাশযান পাঠাতে পারেনি।
মানুষ চাঁদে গেল কখন ?
চাঁদে গেল 1969 এর 16 জুলাই অ্যাপোলো 11 তে করে। নিল আর্মস্ট্রং, এডউইন-ই-অলড্রিন, আর মাইকেল কলিন্স। তবে কলিন্স চাঁদে না নেমে মহাকাশযান নিয়ে কক্ষপথে ঘুরতে থাকেন। মঙ্গলেও মানুষ নভোযান পাঠায়। 19 মে 1971এ মারস—2 মঙ্গলে অবতরণ করে। আশির দশকে মহাশূন্য বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ কিছূ অগ্রগতি সাধিত হয়। এরমধ্যে মহাশূন্যে স্থায়ী স্পেস স্টেশন স্থাপন এবং স্পেসশাটল নির্মাণ।
এক চিমটে চানাচুর মুখে দিয়ে রেখা বলল— স্পেসশাটল মানে ?
তানভীর সাহেব চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন— ফার্স্টক্লাস চা হয়েছে বৌদি।
থ্যাংক ইউ, বললেন কমলা।
তানভীর সাহেব বললেন— স্পেসশাটল হচ্ছে নভোচারীদেরকে বারবার মহাশূন্যে বহন করে আনা নেয়ার জন্য ব্যবহূত একটি যান। একে অনেকবার ব্যবহার করা যায়। 1983 থেকে 1986 পর্যন্ত আমেরিকার মনুষ্যবাহী মহাশূন্যযান চ্যালেঞ্জার কয়েকবার মহাশূন্যে যাতায়াত করে। এটি আবার কানাডা, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের যোগাযোগ উপগ্রহকে কক্ষপথে স্থাপনের কাজেও ব্যবহূত হয়। 1984 ও 1985 সালে মার্কিন স্পেসশাটল ডিসকভারি কানাডা ও আমেরিকার 2 টি উপগ্রহ মহাকাশে প্রেরণ করে।
আমাদের কাছাকাছি দেশের কেউ উপগ্রহ পাঠায়নি ? —কমলা বললেন।
হ্যাঁ, ভারত পাঠায় রোহিণী নামের একটি উপগ্রহ 1980 সালে, পাকিস্তানও পাঠায় 1990 সালে, শ্রীলংকা উপগ্রহ পাঠায় 2012 সালে ।
আকাশ বলল— তাহলে তো অনেক দেশের অনেকগুলো উপগ্রহ আকাশে চক্কর দিচ্ছে।
হ্যাঁ, মহাকাশে 60 টি দেশের হাজার খানেক উপগ্রহ ভেসে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে অব্যহূত রয়েছে শ খানেক।
বাংলাদেশের কোনো উপগ্রহ নেই ? সীমা প্রশ্ন করে।
এখনো নেই, তবে 2017 সালে বঙ্গবন্ধু নামের একটা স্যাটেলাইট উেক্ষপণের পরিকল্পনা রয়েছে।
আনজুম বললেন— তুমি ড্রইংরুমে গিয়ে বসো না প্লিজ। আমি একটু ঘুমোব।
তানভীর সাহেব বললেন— ঠিক আছে, এই তোমরা চলো, ড্রইংরুমে গিয়ে গল্প করা যাবে।
