যমুনার দুর্গম ৩৯ চরে প্রাইমারি স্কুল নেই

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:২১

বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে চরের কিশোরীরা

স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলায় যমুনা নদীর দুর্গম ৮২ চরের মধ্যে ৩৯ চরে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এতে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত দুর্গম চরাঞ্চলের ৫ হাজারেরও বেশি শিশু। অন্য দিকে ৮২ চর জুড়ে নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরের প্রতিষ্ঠান আছে চারটি। দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে পঞ্চম শ্রেণির গণ্ডি পেরোনোর পর শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ছে চরের শিশুরা। ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে চরের কিশোরীরা। আর কিশোররা নানা ধরনের শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ছে।

সারিয়াকান্দি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ১৬৮টি। এসব বিদ্যালয়ে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৬ হাজার ৬৩৮। এর মধ্যে যমুনা নদীর দুর্গম ৮২ চরের মধ্যে ৪৩ চরে প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৪৩টি। চরের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫ হাজার ৯৪৬। বাকি ৩৯টি চরে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা  গেছে, উপজেলায় মাধ্যমিক স্তরে ২৮টি বিদ্যালয় ও ১৪টি মাদ্রাসা আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২১ হাজার ৫০০। এর মধ্যে চরাঞ্চলে চারটি নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১ হাজার ৪০০। বাকি ৭৮টি চরে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই।

চরাঞ্চলের চারটি নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো—চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের আউচারপাড়া নিম্নমাধ্যমিক  বিদ্যালয়, বহাইল ইউনিয়নের বহাইল উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, কাজলা ইউনিয়নের টেংরাকুড়া উচ্চবিদ্যালয় এবং জামথল উচ্চবিদ্যালয়। এর বাইরে কাজলা ইউনিয়নে একটি ভোকেশনাল স্কুল আছে। অন্য দিকে কর্নিবাড়ি ইউনিয়নে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠা হয়েছে শনপঁচার চর নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়। তবে চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের আউচারপাড়া চরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আউচারপাড়া নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কোনো চিহ্ন নেই। নিশ্চিহ্ন আউচারপাড়া চরের লোকালয়ও। আউচারপাড়া নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহজাহান মিঞা বলেন, ২০০০ সালে বহুলাডাঙ্গা চরে ৭৫ শতক জায়গার ওপর এই বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। ২০০৪ সালে তা আউচারপাড়া চরে সরিয়ে নেওয়া হয়। এবারের নদীভাঙনে আউচারপাড়া চরও বিলীন হওয়ায় বিদ্যালয়টির এখন কোথায় ঠিকানা হবে তা নিশ্চিত হয়নি। হাটবাড়ি চরের কালাম শেখ বলেন, এই চর থেকে জুম্মারবাড়ি ও সারিয়াকান্দি ঘাটে নৌকায় যাতায়াতে তিন-চার ঘণ্টা সময় লাগে। এত দুর্গম পথে মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে কেউ সাহস পায় না। ফলে পড়াশোনা বাদ দিয়ে ১২-১৩ বছরে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয়। ছেলেরা বাবার সঙ্গে নদীতে জাল টানে, খেয়ানৌকায় বাবার সঙ্গে মানুষ পারাপার কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে মালামাল পরিবহন কাজে লেগে পড়ে। সারিয়াকান্দি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম কবির বলেন,  উপজেলার ৮২টি চরের মধ্যে ৪৩টি চরে প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও অপ্রতুল। প্রতি বছরই নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে বিভিন্ন চরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো।

সারিয়াকান্দির ইউএনও মো. রাসেল মিয়া বলেন, যমুনার দুর্গম ৮২ চরের মধ্যে ৩৯ চরে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। নেই মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। ফলে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পরপরই চরের অনেক শিশু শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ছে। যাতায়াত সমস্যা, নিরাপত্তার অভাববোধসহ নানা কারণে অল্প বয়সে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে মেয়েরা। বাল্যবিবাহের কুফল নিয়ে উঠানবৈঠক, সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও অব্যাহত আছে চরে।