সুপ্তি জামান
মিষ্টি দেখলেই চোখ চকচকে করে ওঠে। মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে এখনো আড়চোখে তাকাই। ছোটবেলায় মুঠি মুঠি চিনি আর খেজুর গুড়, আখের গুড় খেয়েছি ইচ্ছেমতো। তবে তালের ছোট ছোট পাটালিও সুস্বাদু ছিল। বাতাসা, তালমিছড়ি, শিন্নি, পায়েসেও শৈশব রঙিন হতো বেশ। খুব বিরক্তিকর ছিল তেতো। কোনোভাবেই তেতোকে ভালোবাসতে পারিনি, এড়িয়ে চলেছি। উচ্ছে, করলা মানুষ কেন খায় কিছুতেই বোধগম্য হতো না সেই সময়। দিনের পিঠে দিন এসেছে, আমি একদিন সফিপুর ছেড়েছি, ফ্রক ছেড়েছি। সাপের খোলসের মতো বিশ্বাস-ভাবনাও ছাড়তে হয়েছে কিছু কিছু। পুরনো খোলসে আটকে থাকলে সাপ যেমন বড় হতে পারে না, মানুষকেও পুরনো কিছু ভাবনাচিন্তা তেমন ঝেড়ে ফেলতে হয়।
একটা সময় এলো ভালোবাসার মিষ্টিকে ছাড়তে হবে, তার পরিবর্তে গড়তে হবে তেতোর সঙ্গে মিতালি। ততদিনে বুঝে গেছি মিষ্টিতে অকাতরে ডুবলে জীবনে ভোগান্তি আছে! তেতো তেতো বলেই ওর অনিষ্ট করার কোনো মতলব নেই, বরং আছে উপকার করার অসীম ক্ষমতা। আরো বুঝেছি তেতোর সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি দেখা হয় জীবনে, যতই পাশ কাটাতে চাও না কেন তেতো ওষুধই কিন্তু রোগ সারায়, জীবন বাঁচায়। মায়ের তেতো বকুনি খেয়ে ঘর-গৃহস্থলির যে কাজটুকু সন্তান শেখে—ওটুকুই তার বাকি জীবনের পাথেয়।
সমাজের তেতো কটূক্তির ভয়েই মানুষ সংযত থাকে, মন চায় সব ছেড়ে দূরে পালাই। আর দূরে গেলে ফের ঘরে ফেরার তাড়া। ঘর তো মধুময় কাব্যকলায়, বাস্তবে বরাবর কুরুক্ষেত্র। বাবা-মায়ের ঝগড়া দেখে যে সন্তানের মুখ তেতো স্বাদে ভরে ওঠে, সে যখন বড় হয়ে ঘর বাঁধে—বাবা-মায়ের চেয়েও অধিক ঝগড়া করে, তার সন্তানের মন তেতো হয়। তেতো নিয়ে কত কথা বললাম। এবার আসি আসল কথায়—তেতোকে জীবনে এড়ানো যায় না। আমরা যেটা পারি তাহলো তেতোকে কী করে উপাদেয় করা যায় সেদিকে মনোযোগ বাড়াতে। করলা কিন্তু ঝোল করে কিংবা বড় কিংবা ছোট মাছের সঙ্গে চচ্চড়ি রান্না করলে বেশ লাগে খেতে। তবে চিংড়ি-করলার সিম্পল ভাজি সর্বত্র জনপ্রিয়।
করলায় করোনা দূর হয় এমন গুজব উঠলে কান দেব না। কিন্তু ক্লান্তি দূর করে, দূর হয় বিষণ্ন্নতা। তাই তেতোকে উপাদেয় করার, সহনীয় করার উপায় বের করে তেতোর সঙ্গেও মিতালি গড়ি। শেষে করলা রান্নার একটি ছোট্ট টিপস বলি—এটি আমি আমার নানুর কাছে শিখেছিলাম। টিপসটি হলো তেতো বেশি ঘাঁটাতে হয় না! তাহলে তেতো বেড়ে যায়, অল্প নাড়াচাড়া করেই নামিয়ে ফেলতে হবে। নানু করলা শাক দিয়ে বোম্বাই মরিচযোগে দারুণ ঘন একটা ডাল রান্না করতেন। করলা শাক ভেজেও খাওয়া যায়। করলার বিচির ভর্তাও খুব সুস্বাদু।
অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য
