চীন বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশ। বিশ্বরাজনীতিতে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কেননা, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। চীন আন্তর্জাতিক উদীয়মান শক্তি হিসেবে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। যেমন করোনা ভাইরাস, দক্ষিণ চীন সাগর সংকট, চীন-মার্কিন বাণিজ্যিক যুদ্ধ, ভারত-চীন সীমান্ত উত্তেজনা, হংকং জাতীয় নিরাপত্তা আইন ইত্যাদি।
উপরোক্ত সমস্যাদির মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগর উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয় অংশ বাণিজ্যিক জাহাজ দক্ষিণ চীন সাগর দিয়ে চলাচল করে। এই সাগরের ভূগর্ভে রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যানুযায়ী এই অঞ্চলে ১১ বিলিয়ন গ্যালন তেল ও ১৯০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত রয়েছে। তবে চীন সরকারের অধীনে এক কোম্পানির তথ্যানুযায়ী সেখানে প্রকৃতপক্ষে ১২৫ বিলিয়ন গ্যালন তেল ও ৫০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। চীন প্রতি বছর ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন গ্যালন তেল ব্যবহার করে। তাই ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় এই অঞ্চলের গুরুত্ব ব্যাপক। ইন্দোনেশিয়ার মালাক্কা প্রণালি থেকে তাইওয়ান প্রণালি পর্যন্ত প্রায় ৩৫ লাখ বর্গকিলোমিটারের এক বিরাট এলাকা নিয়ে দক্ষিণ চীন সাগর। এই সাগরে অসংখ্য ছোট-বড় দ্বীপ রয়েছে, তথা স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ, স্কারবরো শোল অঞ্চল, প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জসহ বেশ কিছু প্রবাল দ্বীপ রয়েছে। এছাড়া বেইজিং ভূরাজনৈতিক কৌশলগত কারণে কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে, যা প্রতিবেশী দেশের মাথাব্যথার প্রধান কারণ। দক্ষিণ চীন সাগরের তীর ঘেঁষে রয়েছে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ব্রুনাই, ফিলিপিন, ইন্দোনেশিয়া ও তাইওয়ান। এসব দেশ এই অঞ্চলে চীনের আধিপত্য মেনে নিতে পারছে না। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের অধিকার আদায় ও ফ্রিডম নেভিগেশনের দাবি করে। সম্প্রতি ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পম্পেও বলেছেন, ‘বেইজিং দক্ষিণ চীন সাগরে যেসব অঞ্চল নিজেদের দাবি করছে, তা সম্পূর্ণ অবৈধ।’ এখন প্রশ্ন হলো, দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে কেনো সংকট সৃষ্টি হয়েছে? মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান চীন আক্রমণ করে এই অঞ্চলের দ্বীপসমূহ দখল করে নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর কায়রো ও পটসডাম চুক্তি দ্বারা দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপসমূহ চীনের কাছে হস্তান্তরিত করা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে তত্কালীন চীন সরকার একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে। এতে দক্ষিণ চীন সাগরে ১১টি ড্যাশলাইন আঁকা হয়। একে বলা হয় ইলিভেনে ড্যাশলাইন। কিন্তু মহানেতা মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে নিনা কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৫৩ সালে ইলিভেনে ড্যাশলাইনকে সরলীকরণ করে ৯টি ড্যাশলাইন অঙ্কন করে। একে বলা হয় নাইন ড্যাশলাইন। এই নাইন ড্যাশলাইন অনুযায়ী বেইজিং দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে। কিন্তু জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র তাদের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সামুদ্রিক অঞ্চল নিজেদের দাবি করতে পারে। এছাড়া ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অঞ্চলকে বলা হয় এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন। কিন্তু নাইন ড্যাশলাইন ভিয়েতনাম, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন ও তাইওয়ানে ২০০ নটিক্যাল মাইল অতিক্রম করেছে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ চীন সাগরে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৮৮ সালে সাউথ জনসন রিফ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে চীন-ভিয়েতনাম যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ভিয়েতনামের পরাজয় ও বেশ কিছু দ্বীপ চীন দখল করে। বেশ কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলে উত্তেজনা থাকলেও বর্তমানে প্রকট আকারে রূপ নিয়েছে। কেননা, প্রেসিডেন্ট শিন চিন পিং দক্ষিণ চীন সাগরে বিভিন্ন দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, পারমাণবিক বোমাসম্পন্ন যুদ্ধজাহাজ ও কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণের মধ্য দিয়ে চীনকে এই অঞ্চলে পাকাপোক্ত করেছে। চীনের বিরুদ্ধ যে দেশগুলো আছে, তাদের বন্ধুরাষ্ট্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে ফিলিপিন ও তাইওয়ানের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে ওয়াশিংটন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য এই জলপথ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই চীনের আঞ্চলিক প্রভাব ক্ষুণ্ন করতে প্যান্টাগন এই সাগরে রণসজ্জা সাজিয়েছে। এমন অবস্থায় যদি কোনো ভুল হয়ে যায়, তাহলে উভয় দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই বিশ্বে শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশা আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের পথে হাটবে উভয় দেশ।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
