হারুবাবু সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরছেন। স্টেশন থেকে বাড়ি প্রায় আধ মাইল দূর, বেলাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। হারুবাবু তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলছেন। তাঁর এক হাতে ব্যাগ, আর এক হাতে ছাতা।
চলতে চলতে হঠাত্ তাঁর মনে হলো, কে যেন তাঁর পিছন পিছন আসছে। তিনি আড়চোখে তাকিয়ে দেখেন, সত্যি সত্যি কে যেন ঠিক তাঁরই মতন হনহনিয়ে তাঁর পিছন পিছন আসছে। হারুবাবুর মনে কেমন ভয় হলো—চোর ডাকাত নয়তো! ওরে বাবা! সামনের ঐ মাঠটা পার হবার সময় একলা পেয়ে হঠাত্ যদি ঘাড়ের উপর দু’চার ঘা লাঠি কষিয়ে দেয় তাহলেই তো গেছি! হারুবাবুর রোগা-রোগা পা দুটো কাঁপতে কাঁপতে ছুটতে লাগল। কিন্তু লোকটাও যে সঙ্গে সঙ্গে ছোটে!
তখন হারুবাবু ভাবলেন, সোজা মাঠের উপর দিয়ে গিয়ে কাজ নেই। বড় রাস্তা দিয়ে বদ্যিপাড়া ঘুরেই যাওয়া যাক, না হয় একটু হাঁটাই হলো। তিনি ফস করে ডানদিকের একটা গলির ভিতর ঢুকেই বক্সীদের বেড়া টপকিয়ে একদৌড়ে বড় রাস্তায় গিয়ে পড়লেন। ওমা! সেই লোকটাও কি দুষ্টু সেও দেখাদেখি ঠিক তেমনি করে বেপথ দিয়ে বড় রাস্তায় এসে হাজির!
হারুবাবু ছাতাটাকে বেশ শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন—ভাবলেন, যা থাকে কপালে, কাছে আসলেই দু’চার ঘা কষিয়ে দেব। হারুবাবুর মনে পড়ল, ছেলেবেলায় তিনি জিমনাস্টিক করতেন—দু’তিনবার তিনি হাতের ‘মাসল’ ফুলিয়ে দেখলেন, এখনো শক্ত হয় কি না।
আর একটু সামনেই কালিবাড়ি। হারুবাবু তার কাছাকাছি আসতেই হঠাত্ রাস্তা ছেড়ে ঝোপজঙ্গল ভেঙে প্রাণপণ ছুটতে লাগলেন। পিছনে পায়ের শব্দ শুনে বুঝতে পারলেন যে, লোকটাও সঙ্গে সঙ্গেই ছুটছে! এ কিন্তু ডাকাত না হয়ে যেতেই পারে না! হারুবাবুর হাত পা সব ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগল, কপালে বড় বড় ঘামের ফোঁটা দেখা দিল। এমন সময় হঠাত্ শোনা গেল, সামনে ঘাটের পাশে বসে কারা যেন গল্প করছে।
শুনবামাত্র হারুবাবুর মনে সাহস হলো। তিনি ধাঁ করে ছাতা বাগিয়ে সিংহবিক্রমে ফিরে বললেন, ‘তবে রে! আমি টের পাইনি ঝুঝি? ভালো চাস তো—’ কিন্তু লোকটির চেহারা দেখে হঠাত্ তাঁর বক্তৃতার তেজ থেমে গেল। অত্যন্ত নিরীহ রোগা ভালোমানুষ গোছের লোকটি—ডাকাতের মতো একেবারেই নয়।
হারুবাবু তখন একটু নরম মতো ধমক দিয়ে বললেন—‘খামখা আমার পেছনে পেছন ঘুরছ কেন হে?’ লোকটি অত্যন্ত ভয় পেয়ে আর থতমত খেয়ে বলল, ‘স্টেশনের বাবুটি যে বললেন, আপনি বলরামবাবুর পাশের বাড়িতেই থাকেন, আপনার সঙ্গে গেলেই ঠিকমতো পৌঁছব!—তা আপনি কি বরাবর এইরকম করে বেঁকেচুরে চলেন নাকি?’ হারুবাবু ঠিক এক মিনিট হাঁ করে তাকিয়ে থেকেও বলবার মতো কোনো জবাব খুঁজে পেলেন না। কাজেই ঘাড় হেঁট করে আবার সোজা পথে বাড়ি ফিরে চললেন।
