বেসরকারি উদ্যোগেরও প্রয়োজন

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৩৪

এই জগতের নিয়ম হইল, কেবল নিজে ভালো থাকিলেই সেই ভালো থাকা টিকসই হয় না, অন্যকেও ভালো রাখিতে হয়। নিজেদের অধিকারের পাশাপাশি অন্যদের অধিকারও বিবেচনা করিতে হয়। নচেত্ নিজের অধিকারের উপরও কৃষ্ণছায়া ঘনাইয়া আসিতে পারে। এই কথা সত্য পশুর অধিকারের বেলাতেও। বাংলাদেশে এখন প্রাণিসম্পদে সমৃদ্ধ হইয়া উঠিতেছে; কিন্তু প্রাণীর স্বাস্থ্যসচেতনতার বিষয়টি সমৃদ্ধ হইতেছে কম। অথচ যে কোনো ধরনের প্রাণী অসুস্থ থাকিলে তাহাদের মাধ্যমে মানুষের মধ্যেও রোগ ছড়াইতে পারে। অর্থাত্ প্রাণীর স্বাস্থ্যের অধিকার ক্ষুণ্ন হইলে তাহা মানুষের জন্যও বিপজ্জনক। কতখানি বিপজ্জনক তাহা করোনা ভাইরাস বুঝাইয়া দিয়াছে। এই ভাইরাসটিও কিন্তু প্রাণী হইতেই মানুষের মধ্যে আসিয়াছে। মনে রাখিতে হইবে, পশু-পাখি ও গবাদি পশুর সংস্পর্শে থাকা মানুষের মধ্যে মারণ-ভাইরাসে সংক্রমণের সম্ভাবনা অধিক থাকে।

পশু-পাখি হইতে মানুষের মধ্যে যেই সকল রোগ ছড়ায় তাহাদের বলা হয় জুনোটিক রোগ। কোভিড, সার্স, মার্স, ইবোলা, অ্যানথ্রাক্স, জুনোটিক ইনফ্লুয়েঞ্জা, প্লেগ, জলাতঙ্ক, সালমোনেলোসিস—কত ধরনের জুনোটিক রোগ যে রহিয়াছে! এই জন্য উন্নত বিশ্ব পশুর চিকিত্সার ব্যাপারেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়া থাকে; কিন্তু আমাদের দেশে সেই চিত্র দিনদিন বিবর্ণ হইতেছে। গত সোমবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত ছোট্ট একটি সংবাদ হইতে জানা যায়, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ বড়চরে অবস্থিত পশু হাসপাতালটি মৃতপ্রায়। ১১৭ বত্সরের পুরাতন একটি হাসপাতাল কীভাবে অবহেলায় ধ্বংস হইতে পারে শায়েস্তাগঞ্জের পশু হাসপাতালটি তাহার জলজ্যান্ত উদাহরণ। প্রায় ২৮ শতাংশ জমির উপর ব্রিটিশ সরকারের আমলে নির্মিত এই হাসপাতালে শায়েস্তাগঞ্জ অঞ্চলসহ প্রায় ১০টি চা-বাগানের পশু চিকিত্সাসেবা চলিয়া আসিতেছিল। জানা যায়, পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সাসেবা চালুরত অবস্থায় এরশাদ সরকারের আমলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণে হাসপাতালটির এই করুণ পরিণতি ঘটে। হাসপাতালটি এখন পরিত্যক্ত। কিছু লোক ভাগাড় হিসাবে ইহাকে ব্যবহার করিতেছে।

প্রকৃতপক্ষে, পশু-প্রাণীর ‘অধিকার’ একটি আধুনিক ধারণা। যদিও অকারণে প্রাণিহত্যাও যে অন্যায়, তাহা যে কোনো নীতিগ্রন্থমালায় পাওয়া যাইবে। মানুষ এখন অনেক অধিক সভ্য এবং উন্নত। উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি আমাদের দেশেও এখন প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় রহিয়াছে। গৃহপালিত ও বন্যপ্রাণীর অধিকার নিশ্চিত করিবার জন্য আইনও রহিয়াছে। দেশে বর্তমানে প্রতি উপজেলায় একটি করিয়া ৪৮৩টি উপজেলায়, প্রতি জেলায় একটি করিয়া ৬৪ জেলায় পশু হাসপাতাল রহিয়াছে। ইহা ছাড়াও চারটি গবাদি পশু প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে একটি করিয়া এবং ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা মেট্রোপলিটন এলাকায় আরো ৯টি পশু হাসপাতাল এবং ঢাকাতে একটি কেন্দ্রীয় পশু হাসপাতাল রহিয়াছে; কিন্তু তাহার পরও পশু-পাখির রোগ উপশমে মানবিক গরজের ঘাটতি দেখা যায় খুব বেশি। আমরা শুরুতেই বলিয়াছি, পশু-প্রাণীরও অধিকার থাকিতে পারে—এই বোধটি ‘মানুষ’ নামক শ্রেষ্ঠ জীবটি যদি বিসর্জন দেয় তাহা হইলে আখেরে তাহা মানুষেরই ক্ষতি। সুতরাং পশুর চিকিত্সার ব্যাপারে অবহেলা কাম্য নহে। আমরা মনে করি, মানুষের মতো পশুরও চিকিত্সাসেবায় কেবল সরকারের উপর নির্ভর করিয়া থাকিলে চলিবে না, বেসরকারি পর্যায়েও ইহার পরিসর বাড়াইতে হইবে।