নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় ইরান ও ভেনেজুয়েলা

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৩৫

পারস্য উপসাগরীয় দেশ ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি বৈরিতা বিদ্যমান। ১৯৮০ সাল থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের সুরক্ষার শক্তি হিসেবে পাকিস্তান ও ইরানে সুইজারল্যান্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি হিসেবে কাজ করে। স্মর্তব্য, বারাক ওবামার আমলে (২০১৫ সালে) ইরানের সঙ্গে পরমাণু অস্ত্র তৈরি ও তার বিস্তার সম্পর্কে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ পরাশক্তি ও জার্মানি ইরানের সঙ্গে (wc5+1) চুক্তিবদ্ধ হয়। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে ইরানের সঙ্গে বিরোধকে আরো তুঙ্গে তুলেন। ২০১৮ সালের মে মাসে সেই চুক্তি থেকে বেড়িয়ে যান এবং ইরানের ওপর আরো কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। যার ফলে বিরাট অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে ইরান। অন্যদিকে, দক্ষিণ আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক দেশ ভেনেজুয়েলার ওপরেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ২০১৮ সালে সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো পুনর্নিবাচিত হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আমেরিকা। যা কয়েকবার নবায়ন করেছে ওয়াশিংটন। ভেনেজুয়েলায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে কয়েকটি দেশ এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে মরিয়া হয়ে ওঠে। সমাজতান্ত্রিক সরকারকে উত্খাত করে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে জুয়ান গুয়াইডোকে সমর্থন করেন ট্রাম্প। কিন্তু রাশিয়া-তুরস্ক-ইরান জোটের কাছ থেকে তার ট্রাম্প কার্ড সফলতা আনতে পারেনি! ভেনেজুয়েলায় রাশিয়ার সঙ্গে না পেরে পিছু হটেন ট্রাম্প। কিন্তু ভেনেজুয়েলার মাথার ওপর চাপিয়ে দেন আমেরিকার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ‘নিষেধাজ্ঞা’। ওয়াশিংটনের এমন একতরফা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশিলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয় মাদুরো সরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর প্রায় শতাধিক দেশের কোম্পানি ও ব্যক্তিবর্গের ওপর সাধারণ ও ‘স্মার্ট নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করে রেখেছে। ইরান ও ভেনেজুয়েলা পরস্পর সহযোগিতার মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে ওঠছে। কারো প্রতি রাগ কিংবা অভিমান করে কেউ যদি সম্পর্ক ছিন্ন করতে অল্প দিনের মধ্যে মীমাংসা করে নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, ছিন্ন সম্পর্কের মেয়াদ বেশি হলে একে অপরকে ছাড়া বাঁচতে শিখে যায়। প্রথমে কিঞ্চিত্ কষ্ট হলেও পরে তা স্বাভাবিক রূপ লাভ করে। সদ্য সংকট কাটিয়ে ওঠা ইরান ও ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক সম্পর্ক একথার বাস্তব প্রমাণ। বস্তুত, নিষেধাজ্ঞা কেন আরোপ করা হয়?

এই প্রশ্নের উত্তরে ইউনিভার্সিটি অব স্যালফোর্ডের অধ্যাপক মরটিজ পিয়েপার বলেছেন, ‘একটি দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেন যদি আপনি ঐ দেশটির আচরণে পরিবর্তন দেখতে চান’। আবার নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় এক দেশ আরেক দেশের ওপর প্রতিশোধ হিসেবেও আরোপ করে। প্রতিশোধমূলক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এ দেশগুলোর মধ্যে শত্রুতাই বৃদ্ধি করেছে; তাদের সরকারের আচরণে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং দুই দেশের জনগণের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে আমেরিকা। তেহরান ও কারাকাসের কূটনৈতিক সম্পর্ক মার্কিন জোটে বেশ উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বছরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারের অবৈধ নিষেধাজ্ঞাসহ চাপ সৃষ্টির কৌশল ও ষড়যন্ত্রকে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলে অবহিত করেন। তিনি এই মার্কিন ষড়যন্ত্র মোকাবিলার মৌলিক উপায় হিসেবে প্রতিরোধকে বেছে নিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞার ফলে ভেনেজুয়েলায় পরিশোধিত তেলের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় ইরান সম্প্রতি পাঁচটি ট্যাংকারে ল্যাটিন আমেরিকার দেশটিতে প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল পাঠিয়েছে। ইরানের তেল ট্যাংকারের যাত্রা বাধাগ্রস্ত করার জন্য মার্কিন নৌবাহিনী ক্যারিবিয়ান সাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েও কিছু করতে পারেনি। ভেনেজুয়েলায় ইরান পণ্য রপ্তানি করেছে এবং কারাকাসে একটি সুপার মার্কেটও খুলেছে। ইরানের এমন উদ্যোগ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক বেশ উষ্ণতায় নিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট মাদুরো ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ঘোষণা দিয়েছেন। এতে বেশ উদ্বিগ্ন হয়েছে আমেরিকা। মাদুরো ঘোষণাটি এমন সময় দিলেন, যখন জাতিসংঘ আরোপিত ইরানের প্রতি নিষেধাজ্ঞা শেষ হতে চলেছে এবং নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের দাবিতে নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকা দুইবার হোঁচট খেয়েছে। আমেরিকার ‘স্ন্যাপব্যাক’ মেকানিজম চালুর প্রক্রিয়াও সমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অনলাইন মিটিংয়ে ১৫টি রাষ্ট্রের ১৩ রাষ্ট্রই আমেরিকার বিপক্ষে ভোট দেয়। ফলে পম্পেওর আবেদন সম্পূর্ণ খারিজ হয়ে যায়। এই হার আসন্ন নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ইরান শুধু ভেনেজুয়েলাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ঘোর প্রতিদ্বন্দ্ব্বী চীনের সঙ্গেও ২৫ বছরের ‘কৌশলগত সহযোগিতার’ চুক্তিতে সমঝোতায় পৌঁছেছে। তাদের বিনিয়োগের সম্ভাব্য পরিমাণ ৪৪ বিলিয়ন ডলার। এতে ইরান অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে; পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ভূরাজনৈতিক প্রভাবও বৃদ্ধিপাবে। আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য ধীরে ধীরে খর্ব হবে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমেরিকার এই একতরফা নিষেধাজ্ঞায় ইরানের চেয়ে আমেরিকার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইরানের ওপর থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ওঠে গেলে ইরান তাদের মিত্রদের সঙ্গে সমরাস্ত্র ও প্রতিরক্ষামূলক সম্পর্ক আরো জোরদার করবে। ফলে আমেরিকার জন্য ইরান হয়ে ওঠবে বিরাট হুমকি।

n  লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়