আমাদের সমাজ ও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৩৬

সমাজ ও মানুষ—এ দুটি শব্দ একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সমাজ মানুষের বহুমুখী প্রয়োজন মিটিয়ে উন্নত ও নিরাপদ সামাজিক জীবন দান করে। তারই ধারাবাহিকতায় যার যার জায়গা থেকে আমরা নিত্যদিনের ব্যস্ততার মধ্যে নিজেকে কীভাবে আরো এগিয়ে নেওয়া যায় সেই চিন্তা করি। যে যার জায়গা থেকে চিন্তা করি কীভাবে আরো ভালো থাকা যায়। কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার এই চিন্তাটা আমাদের কেন যেন সমাজকেন্দ্রিক। আমাদের পথ চলার প্রতিটি ক্ষেত্রে বা সিদ্ধান্তে আমরা আদিকাল থেকেই সমাজকে বড্ড বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছি। কোনো কাজের শুরুতে আমরা সেই কাজটি নিয়ে যতটুকু না ভাবছি, তার চেয়ে সমাজের কিছু মানুষের মন্তব্য নিয়ে বেশি ভাবি।

সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আশপাশের প্রতিটি জিনিস উন্নত হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডাকবাক্স ছেড়ে দেশ-বিদেশের যোগাযোগের মাধ্যম এখন সেকেন্ডের ফোনকলে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এখন একটা ফোনকল যেমন সেকেন্ডের মধ্যে একজনকে আরেকজনের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, আমাদের সমাজ বা আশপাশের মানুষের চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি কি এতটা দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে? যেহেতু মানুষের জীবন এখন অনেকটা প্রযুক্তিমুখী হয়ে গেছে, তার সঙ্গে আমাদের তরুণ সমাজের চিন্তাভাবনা ও কাজকর্মে সেই প্রযুক্তির আধুনিক ছোঁয়া লাগবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থা এখনো অনেক মানুষই স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না বা চাইছে না।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও)-এর মতে, দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে বেকারের সর্বোচ্চ হারের দিক থেকে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করছে। যে হারে মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে, সেই হারে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।  কর্মসংস্থানের জন্য প্রথমে সবাই কোন ভালো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য চেষ্টা করেও যখন সুযোগ পায় না, তখন ছেলেরা বিশেষ করে চাকরির বেড়াজাল থেকে বের হয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। ঠিক তখনই পাড়া-প্রতিবেশী থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজনদের নানা ধরনের মন্তব্য শুরু হয়ে যায়। যেমন—এত পড়াশোনা করে একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে পারোনি? তাহলে পড়াশোনা করার কী দরকার ছিল? ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রথমত বেকারত্ব, দ্বিতীয়ত এতশত মন্তব্যে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে নিজেদের লাগাম হারিয়ে ফেলছে হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার। এটা আমাদের সমাজের খুব সাধারণ চিত্র।

আমাদের সমাজ পর্যাপ্ত পরিমাণে না হলেও পুরুষদের যেভাবে সাপোর্ট করে, নারীদের ক্ষেত্রে তা একদমই ভিন্ন। একজন পুরুষ যা করতে পারে, তুমি কখনোই তা করতে পারো না। শহর পর্যায়ে ইদানীং এই চিত্রের কিছুটা পরিবর্তন হলেও গ্রামের দিকের এই সমস্যাটি ভয়াবহভাবে প্রভাব ফেলে আসছে সেই আদিকাল থেকে। এখানে সকাল হলেই গলির মোড়ের চায়ের কাপে সমালোচনার ঝড় শুরু হয়ে যায়—কার বাড়ির মেয়ে কতটা ভালো এবং কার বাড়ির মেয়ে কতটা খারাপ, কোন মেয়ের পোশাক কেমন, কোন মেয়ের হাঁটাচলা কেমন ইত্যাদি।  উচ্চশিক্ষার জন্য যখন একটি মেয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হতে চায়, তখন সমাজের কিছু অশিক্ষিত মানুষ তাকে নানা ধরনের দোষ দেখিয়ে ঘরে বসিয়ে দেয়। একটি প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইলে বিয়ে হচ্ছে না বলে সমাজের মানুষ কুত্সা রটনা করে। একটি ডিভোর্সি মেয়ে যখন বাড়িতে থাকে, তার বাবা-মাকে উঠতে বসতে সমাজের মানুষের নোংরা কথার সম্মুখীন হতে হয়। পাড়ার পড়াশোনা শেষ করা একটি ছেলের আগে একটি মেয়ে ভালো চাকরি পেয়েছে—বলবে, অবশ্যই অফিসের বসের সঙ্গে মেয়েটির কোনো সম্পর্ক আছে। আর গায়ের রং কালো হলে তো কথাই নেই। হ্যাঁ এই সমাজেই আমরা বসবাস করি। সমাজ কখনোই একজন নারীকে নারী ছাড়া মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করে না। তবে এক্ষেত্রে সব দোষ কিন্তু সমাজের নয়। কারণ আমরা বর্তমান যুগে এসেও সমাজকে এতটা গুরুত্ব দেই বলেই সমাজ এতটা সুযোগ পায়।

সবকিছুরই ভালো আর খারাপ দিক থাকে। সমাজেরও ঠিক তেমনি খারাপ দিক থাকলেও ভালো দিক অবশ্যই আছে। কারণ আমরা একা বাঁচতে পারি না। এক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই উচিত সমাজের ভালো দিকটি গ্রহণ করা। যার যার পরিবারকে গুরুত্ব দিয়ে নিজের জন্য বাঁচাটা আমাদের নিজেদেরই শিখতে হবে। একটু স্বার্থপরতা ও একটু আত্মত্যাগের মাধ্যমেই একটি সুন্দর জীবন গড়ে উঠতে পারে। তবে আত্মমর্যাদার ওপর বড় কিছু নেই। তাই আত্মমর্যাদার সঙ্গে কোনো আপস নয়। নারীদের ক্ষেত্রে স্বামী বা বাবার অনেক সম্পত্তি থাকলেও  প্রয়োজনে না হলেও নিজের আত্মিক শান্তির জন্য পরিচিতি বা জায়গা তৈরি করা উচিত। জীবনের জটিলতায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না। আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে আমাদের জীবনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া