বাংলাদেশের অধিকাংশ নৌপথে যুগ যুগ ধরিয়া প্রকাশ্যে অনুমোদনহীন ট্রলারে যাত্রী পরিবহন করা হইতেছে। অথচ ট্রলারের ক্ষেত্রে অবশ্যই ন্যূনতম ১৬ অশ্ব ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিন স্থাপন করিবার নিয়ম রহিয়াছে। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের নীতিমালায় এমন নির্দেশনা থাকিলেও বাস্তবতা ভিন্ন। সম্প্রতি মাত্র এক মাস চার দিনের ব্যবধানে নেত্রকোনায় দুইটি নৌদুর্ঘটনায় ২৮ জনের প্রাণহানি ঘটিয়াছে। নৌকার বাঁচিয়া যাওয়া এক যাত্রীর বয়ান হইতে জানা যায়, একজন যাত্রী নদীর পাড় হইতে ডাক দেওয়ায় হঠাত্ করিয়া তাহাদের বহনকারী ট্রলারটি ঘুরাইয়া ফেলা হয়। এই সময় বালুবাহী একটি ট্রলার যাত্রীবাহী ট্রলারটিকে ধাক্কা দেয়। তাহাতেই মুহূর্তের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রলারটি উলটাইয়া যায়। একটি শ্যালো ইঞ্জিন লাগাইয়া মাঝারি মানের নৌকাকে ট্রলারে রূপ দেওয়ার বিপদ অনেক। প্রকৌশলের দিক হইতে, ইঞ্জিনের গতির তুলনায় নৌযানের আকৃতি ও গঠনের কারণে একটি ট্রলার খুব সহজেই ভারসাম্য হারাইয়া ফেলে। তাহা ছাড়া ইহার ব্যাক গিয়ার থাকে না। চোখে লালপট্টি বাঁধা পাগলা ষাঁড়ের মতো ইহা গোঁ ধরিয়া শুধু সম্মুখেই অগ্রসর হইতে পারে। অথচ একটুখানি সতর্ক হইলে এবং নিয়ম মানিয়া চলিলে বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া নৌপথে এই ধরনের বিবিধ দুর্ঘটনা এড়াইয়া যাওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের নৌপথ অপার সম্ভাবনাময়। নৌযান হইল জ্বালানিসাশ্রয়ী পরিবহনব্যবস্থা। এক লিটার জ্বালানি তেল ব্যবহার করিয়া নৌপথে এক টন পণ্য প্রায় ১২৫ কিলোমিটার কিংবা তাহারও বেশি দূরত্বে পরিবহন করা সম্ভব। অন্যদিকে একই পরিমাণ জ্বালানি তেলে এক টন পণ্য রেলের ক্ষেত্রে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার আর সড়কের ক্ষেত্রে মাত্র ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পরিবহন করা যায়। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে এখনো নিয়মিতভাবে প্রায় ৩০ লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। আমাদের মোট নৌপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার—যাহার মধ্যে বর্ষা মৌসুমে মাত্র ৬ হাজার কিলোমিটার আর শুষ্ক মৌসুমে ৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ যন্ত্রচালিত নৌযান চলাচলের উপযোগী। এই পথে দিবারাত্রি নিরাপদে নৌযান পরিচালনার জন্য চ্যানেল মার্কিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ প্রায়ই দেখা যায়, চ্যানেল মার্কিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত বয়া, বিকন বাতি নাই। কিংবা থাকিলেও তাহা প্রায়শই চুরি হইয়া যায় অথবা সেইগুলি ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে।
বাংলাদেশে নৌপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রাচীন। স্বাধীনতার পর তত্কালীন রেল, নৌ ও সড়ক পরিবহন খাতের সমন্বয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে বন্দর, জাহাজ চলাচল ও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে সংগতির মধ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ মনোযোগ প্রদান করিয়াছে। যাহারা প্রথম উদ্যোগী হয়, তাহাদের দায়িত্বও বেশি থাকে উহার সমস্যা যথাযথভাবে শনাক্ত ও সমাধানের ক্ষেত্রে। কারণ, তাহাদের তৈরিকৃত ভিত্তির উপরই পরবর্তী সময়ে কেবল অল্পবিস্তর সংস্কার করা হয় মাত্র। সুতরাং নৌপথকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগানো এবং নিরাপদ করিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ দৃষ্টি প্রদান করা আবশ্যক।
