কেওড়াবনে ইয়াবাচোরের পলায়ন

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:০২

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম

টেকনাফের সাবরাং লাফারঘোনা পয়েন্টে সেদিন ধরা পড়েছে ১ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবা বড়ি। যার দাম ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। তার পরদিন কোস্ট গার্ডের কাছে সাবরাং খুরেরঘাট এলাকায় মোটরসাইকেল আরোহীর ব্যাগ থেকে ধরা পড়ল আরো ৫৬ হাজার। প্রতিবেশী মিয়ানমার এসব ইয়াবার উত্সস্থল। নাফ নদীর তীরে তো ইট-কাঠের বেড়া নেই। আছে মানববেড়া। সীমান্তরক্ষীদের সতর্ক দৃষ্টিতে এবার ইয়াবাভর্তি নৌকা ফেলে লাফারঘোনা পয়েন্টের কেওড়াবনের দিকে লাফিয়ে ভোঁ দৌড় দিয়ে পালিয়ে গেছে চোরাচালানি চক্রের সদস্যরা। হঠাত্ করে বেড়ে গেছে মাদকের চোরাচালান। দেশের ৩২ জেলার ৪২টি সীমান্ত পয়েন্টের ফুটো দিয়ে ঢুকছে মাদক ফেনসিডিল। টেকনাফের ৩০টি পয়েন্ট দিয়ে আসছে ইয়াবা। এই উপজেলার ২৫ কিলোমিটার সীমান্তপথ অরক্ষিত। এই পথে চারটি পয়েন্টে বেশ জমজমাট মাদক ব্যবসায়। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় একশ্রেণির ব্যবসায়ীর মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে মাদকদ্রব্য (দৈনিক ইত্তেফাক, ০৮.০৯.২০২০)।

একশ্রেণির ব্যবসায়ী নামের লোভী পিশাচ নতুন বিত্তশালী ব্যক্তির সহায়তায় ঘৃণ্য এই মাদক ব্যবসায় এখন বেশ জমজমাট। তারা নিজেরা মাদক বেচাকেনা ও সেবন করে। ভয়ংকর সংবাদ হলো—এখন দেশের প্রতিটি গ্রামে মাদক পাওয়া যাচ্ছে বলে সংবাদ এসেছে। তাহলে কি পুরো দেশটা মাদকের আখড়া হয়ে গেছে? এমনটি হলে আমাদের দেশের ভবিষ্যত্ কী?

সীমান্তে মাদক প্রতিরোধের জন্য নিয়োজিত দায়িত্বরত পাহারাদারদের এত তত্পরতার মধ্যেও দেশের ভেতর ইয়াবা, ফেনসিডিল ইত্যাদির জমজমাট ব্যবসায় চলতে থাকা খুবই ন্যক্কারজনক ঘটনা। ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকা এসব ঘটনা আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ-জীবনে ঘৃণ্য অপরাধমূলক অধ্যায়ের ক্ষেত্র তৈরি করে ফেলেছে। তাই তো ঐ সব সেবাদানকারীদের ভূমিকা থাকা-না-থাকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়ে জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। অবৈধ মাদক ব্যবসায় যদি স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ক্রমাগতভাবে চলতেই থাকে, তাহলে সেই সাইনবোর্ডসর্বস্ব উর্দিপরা পাহারা বসানোর আদৌ কি কোনো প্রয়োজন আছে? দেশের প্রতিটি গ্রামে যদি মাদকের প্রাপ্তি ঘটে, সব জায়গায় যদি মাদক ব্যবসায়ী ও এর মদতদাতা খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে এই বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবার দিন ঘনিয়ে এসেছে।

করোনার সময় ঘরে বসে নিত্যপণ্য হাতে পেতে নিরাপদ ই-ব্যবসায় চালু হয়েছে শহরগুলোতে। তৈরি খাবার, কাঁচাবাজার, ইলেকট্রনিকস, ওষুধ, বিলাসদ্রব্য সবকিছু মোড়কে ভরে বাড়িতে সরবরাহ হতে থাকার সুবাদে মাদকব্যবসায়ীরা বড় সুযোগের হাতছানির সন্ধান পেয়ে যায়। মাদকসেবীদের হাতে হোম ডেলিভারির মাধ্যমে মাদকদ্রব্য ঘরে ঢোকার পথ খুঁজে পায়। এরপর কুরিয়ার সার্ভিসে জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন পরিষদ ও গ্রামের হাটবাজারে নিত্যপণ্যের মাধ্যমে দ্রুত মাদক সরবরাহ হতে থাকে। পথে চেকআপ করার নিয়ম থাকলেও করোনার ভয়ে নিয়মিত চেক করা হয়নি। এই কারণ দেখিয়ে বিনা চেকিংয়ে নিষিদ্ধ পণ্য চলে যেতে থাকে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কোন কোন পথে স্বয়ংক্রিয় স্ক্যানার বসিয়ে একটু কড়াকড়ির বিষয় ঘটলে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে তা ছেড়ে দেওয়ার অলিখিত নিয়ম তো আগে থেকে চালু করাই ছিল। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রণ বেড়া ও বেপরোয়া ঘোড়াদের অবৈধ আয়ের পথ নিষ্কণ্টক করতে বিভিন্ন উপায় খুঁজে বের করার জন্য আরো নিত্য নতুন কৌশল তৈরি করা হয়। এভাবে লোভনীয় এই ব্যবসায় চলতেই থাকে।

এজন্য কেউ ধরা পড়ে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হলে ওপরওয়ালা গডফাদারদের ফোন শুরু হয়ে যায়। আমাদের দেশে নৈতিক চরিত্রহীন কিছু মানুষের ছত্রছায়ায় ঘুষ ও পেশিশক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত এই ন্যক্কারজনক ব্যবসায় চালু রয়েছে—যা সবাই জানে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক চৌকশ ও নীতিমান সদস্যের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে তদন্তকাজে কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু অনেক সময় ওপরমহলের অযাচিত হস্তক্ষেপে তারা ভালোভাবে তদন্ত করেও এর সঙ্গে আইনের কঠোরতার প্রয়োগ বা কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পেরে নতজানু হয়ে যান। ফলে মাদক ব্যবসায় করে ও ব্যবসায়ে সহায়তা করে সহজে বেঁচে যাওয়ার এই ঘৃণ্য পদ্ধতি চালু থেকেই যায়। এভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকে মাদক পাচার ও ব্যবসায়। সংশ্লিষ্ট সবাই বেপরোয়াভাবে এই ব্যবসায় নিয়ে মাতামাতি করার সুযোগ পায়।

দেশের নাগরিকদের সত্ কাজের প্রতি আগ্রহ ও অন্যায়-অসত্ কাজের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টির জন্য মোটিভেশনাল তেমন কিছুই সমাজে চোখে পড়ে না। চারদিকে অসম প্রতিযোগিতা ও হতাশা বেড়ে যাওয়ায় ভালো হওয়ার জন্য তেমন কিছুই মানুষকে উত্সাহ জোগায় না। শুধু মনে হয়, আমাদের দেশে কবে সেই সুদিন হবে, যেদিন দিকে দিকে মানুষের মানবতা জেগে উঠে ছোট-বড় সব চোরের উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে। সেদিন লাফারঘোনার কাছে সমুদ্রপাড়ের কেওড়াবনে ইয়াবাচোরের মতো আর কোথাও কোনো চোর পালাতে সুযোগ পাবে না।

n লেখক :রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান