অমিতা সিনহা
সিলেট শহরের মণিপুরি অধ্যুষিত শিবগঞ্জ এলাকায় মণিপুরি পরিবারে বেড়ে উঠেছেন আতিয়া মাইবাম। কৈশোর পেরিয়ে এখন তাঁর বয়স ২৭ ছুঁইছুঁই। কিন্তু এখনো আতিয়া নিজস্ব ভাষার বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেননি। শুধু নামটুকুই মণিপুরি বর্ণমালায় লিখতে পারেন।
খুব আদর করে মা-বাবা নিজস্ব ভাষাতেই নামটি রেখেছিলেন তরুণী চিত্রশিল্পী আতিয়ার। মণিপুরি ভাষায় আতিয়া অর্থ আকাশ। শুধু আতিয়া নন—সিলেটে প্রায় ১২টি এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস রাজবংশী মণিপুরি সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর। এই জনগোষ্ঠীর হাতেখড়ি স্ব ভাষার বর্ণমালা নিজ গৃহে চর্চা না থাকায় নতুন প্রজন্মের মণিপুরিদের কাছে এখনো আক্ষরিকভাবে অধরাই রয়ে গেছে। এদেশে বসবাসকারী মণিপুরি সম্প্রদায়ের রয়েছে নিজেস্ব ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতি। রয়েছে জাতিগত ইতিহাস। তবে নানাবিধ জটিলতাও স্ব স্ব গৃহে নিজস্ব বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত না হওয়ায় তারা মাতৃভাষার লিখিত রূপ ছাড়াই মৌখিকভাবেই লালন পালন করে যাচ্ছে নিজেদের মধ্যেই। পাশাপাশি অন্যান্য ভাষাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পড়ালেখা করে যাচ্ছে এই প্রজন্মের মণিপুরিরা।
রাজবংশী মণিপুরি জাতিগোষ্ঠীর বর্ণমালা একসময় বহুবিধ কারণে হারিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এই সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ বর্ণমালাকে সংগ্রহ করে আবারও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিদ্যাপীঠে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করে। যার ফলে ভারতের মণিপুর রাজ্যে মণিপুরিরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চতর পর্যায়ে পড়ালেখা করে যাচ্ছে নিজেদের ভাষায়। একই ধারা অব্যাহত রাখতে এদেশে বসবাসকারী রাজবংশী মণিপুরিরাও ছোট ছোট সংগঠন গড়ে নিজস্ব বর্ণমালা সংগ্রহ করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি রাজবংশী ভাষার বর্ণমালা জীবন্ত রূপে ফিরে পেতে সরকারি পাঠ্যবইয়ে লিপিবদ্ধ করার জন্য দাবি করে আসছেন। জানা যায়, বর্তমান সরকার এদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কয়েকটি ভাষাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পাঠ্যবইয়ে লিপিবদ্ধ করেছে। কিন্তু সেখানে ঠাঁই হয়নি মনিপুরী ভাষার।
প্রসঙ্গক্রমে মিরের ময়দানের বাসিন্দা সংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তাওরেম রাতুল সিনহা (২৬) বলেন, মণিপুরি ভাষা আমাদের মাতৃভাষা। তাই স্ব-ভাষার বর্ণকে ধরে রাখতে হলে শুধু সাময়িক সময়ের জন্য প্রচারের উদ্যোগ নিলেই হবে না। চাই নিয়মিত ঘরে-বাইরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক চর্চা। এ ব্যাপারে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মণিপুরি নতুন প্রজন্মকেই উদ্যোগী হতে হবে বলে জানান লালাদীঘি পাড়ার বাসিন্দা নবীন নাট্যকর্মী ও লেখক শেরাম চিংখেই। তিনি বলেন, এখন তরুণ প্রজন্ম খুবই সচেতন। তাই তারা নিজ মাতৃভাষার বর্ণকে আয়ত্ত করতে না পারলেও বাংলা অথবা ইংরেজি বর্ণমালা দিয়ে মণিপুরি মাতৃভাষা লিখিতভাবে চর্চা করে যাচ্ছে। আর এটা আমাদের জন্য খুবই ইতিবাচক দিক।
মণিপুরি সম্প্রদায়ের গবেষক ও কবি অনন্ত কুমার শেরাম বলেন, নিজস্ব মাতৃভাষাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিদ্যাপীঠে পাঠদান কর্মসূচি অবশ্যই প্রয়োজন। এজন্য আমরা ছোট ছোট সংগঠন গড়ে তুলে স্ব বর্ণমালায় বই-পুস্তক প্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের মাঝে পাঠদান কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। সরকার অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার মতোই মণিপুরি ভাষাকে যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিদ্যাপীঠের পাঠ্যপুস্তকে লিপিবদ্ধ করে, তাহলে সব ধরনের সহযোাগিতার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি।
সিলেট
