দেশ জুড়ে কৃষকের লড়াই...

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:১২

ধানের সবুজ চারা সূর্যের আলোয় ঝলমল করে ওঠে। জমিতে ধানের চারা রোপণ দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। বন্যার দুঃসহ স্মৃতি ভুলে কৃষকের হাতে ধান রোপণের দোলায়িত ছন্দে ফুটে উঠেছে জীবনের ছন্দ।

একদিকে মহামারি করোনার আঘাত আরেকদিকে বন্যা ঝড় জলোচ্ছ্বাসে বিপর্যস্ত মানুষ। দেশের ৩৪ জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফসলের খেত, মানুষের ঘরবাড়ি, গবাদি পশু, মাছ ও চিংড়ির ঘেরের। সেই ক্ষতিকে বুকে চেপে নিয়েই আবার জীবন সংগ্রামে নেমেছেন দেশের মানুষ। জমিতে ধানের বীজ বুনে নতুন জীবনের প্রত্যাশায় কৃষকের লড়াই শুরু হয়েছে দেশ জুড়ে। বন্যার ক্ষতি, ঝড় জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবার প্রত্যয় যেন ফুঠে উঠেছে বাংলার দিগন্তবিস্তৃত ফসলের মাঠে মাঠে।

বিভিন্ন জেলা থেকে আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, শত কষ্টের মধ্যেও নিজ উদ্যোগেই ঋণ করে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আবারও নতুন করে চাষাবাদ শুরু করেছেন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। আমন চারা রোপণের পাশাপাশি শাকসবজি, তরকারি, মরিচের চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

এবারের বন্যায় ১ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সারা দেশে ৩৪ জেলার মোট ১ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর ফসলি জমি সম্পূর্ণভাবে প্লাবিত হয়েছে। আর ৭০ হাজার হেক্টর জমির ফসল বন্যায় ভেসে গেছে। সরকারি হিসাবে দেশে এবার ৯ লাখ কৃষক বন্যায় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ফসলের জমি।

ঋণ করে ধানের চারা সংগ্রহ করছেন কৃষকরা

যখন বন্যা হয় তখন সরকারি বেসরকারি নানা পর্যায় থেকে ত্রাণের দেখা মেলে। বন্যার প্রথম পর্যায়ে কিছু সহযোগিতার দেখা মিললেও বন্যার পানি নেমে যাবার পর যে লড়াই শুরু হয় সেখানে কৃষক একা। এ সময় কৃষকরা কিভাবে নতুন করে জীবন শুরু করবেন জমিতে ফসল বুনবেন সে সহযোগিতার দেখা মেলা কঠিন। সরকারিভাবে ধানের চারা দেওয়া হয় কিন্তু এই সময় সংসার চালানো, জমি তৈরি করা ও নতুন ফসল লাগানোতে টাকার প্রয়োজন হয়। প্রয়োজন হয় লোকবলের। সেই কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই যাচ্ছেন এখন কৃষকরা। এই বন্যা কৃষকদের ঋণের দায়ে জড়িয়ে ফেলে। বন্যার পর নতুন করে কাজ শুরু করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় টাকার। সেই টাকা সংগ্রহে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন তারা। সেই ঋণ শুধতে চলে যায় আরো কয়েক বছর।

সরকার দাবি করছে, তাদের কাছে আমনের চারা মজুত আছে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। কিন্তু মাঠের চিত্র তা বলছে না। দেশের মোট ফসলের ৮৫ শতাংশ উত্পাদন করেন যেই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এবং কৃষিশ্রমিক যারা এই কাজের বাইরে অন্য কোনো কাজ করেন না, তারা কষ্টে আছেন। কৃষকের পকেটে পয়সা নেই। তাই বীজ নেই, চারা নেই।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার লেঙ্গাবাজার গ্রামে কৃষক সুলতান মিয়া (৫৫) জানান, চার বিঘা জমি চাষাবাদ করে সেই ফসল দিয়ে খাওয়াদাওয়া ও দুই ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচও চালান। কিন্তু এ বছর বন্যায় তার সব বিছন (চারা ধান) নষ্ট হয়েছে। তাই ধারদেনা করে ৬ হাজার টাকায় ১২ পোন চারা ধান সংগ্রহ করে এই চার বিঘা জমিতে ধান রোপণ করেছেন।

একই জেলার ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের মধ্যউড়িয়া গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম (৪৬) বলেন, ‘একটি ছাগল বিক্রি করে তুলসীঘাট হাট থেকে বেছন (চারা) সংগ্রহ করে তিন বিঘা জমিতে ধান রোপণ করেছি।’

শুধু সুলতান ও রফিকুল নয়। চারা ধানের অভাবে এবার জেলার কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। পরে ধারদেনা করে গাইবান্ধার বিভিন্ন হাট থেকে চড়া দামে আমনের চারা সংগ্রহ করে কৃষকরা রোপণ করেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মুঈদ জানান, ‘সরকার কৃষকদের মধ্যে আমনের চারা ও মাসকালাইয়ের বীজ এবং শাকসবজির বীজ প্রণোদনা দিচ্ছে। বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে যথেষ্ট আমনের চারা বন্যামুক্ত এলাকায় মজুদ আছে। এর পরিমাণ ১১৩ শতাংশ।’

এ বিষয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলা জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার চিনাডুলি ইউনিয়নের ভুক্তভোগী কৃষক আনোয়ার, বদিউজ্জামন, সিদ্দিক মণ্ডল, সামছুল হক, আব্দুর রহমান জানান, উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন এবং ১টি পৌরসভার মধ্যে সরকারিভাবে মাত্র ৫১২ জন কৃষককে সামান্য কিছু রোপা আমন চারা, আর বেশির ভাগ কৃষকের শাকসবজির বীজ দিয়ে বিদায় দেওয়া হয়েছে। তাও চাহিদার তুলনায় তা ছিল খুব কম।

কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, কৃষি মন্ত্রণালয় যে সব কর্মসূচি নিয়েছে তাতে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠা যাবে এবং আমনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, বন্যায় আউশ, আমন, সবজি, পাটসহ বেশ কিছু ফসলের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষতি কমিয়ে আনতে অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিকল্প বীজতলা তৈরি, ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে বিকল্প ফসলের চাষের ব্যবস্থা, নিয়মিতভাবে আবহাওয়া মনিটরিংসহ প্রস্তুতি চলছে যাতে করে বন্যার কারণে ফসলের ক্ষতি মোকাবিলা করা যায়।

জেলায় জেলায় কৃষকের সংগ্রাম

এ বছর দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় ৩৪টি জেলা প্লাবিত হয়েছে। বরাবরের মতো এ বছরেও কুড়িগ্রামের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র এই জেলার ধরলা নদীর দুই ধারে ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় ১০টি ইউনিয়ন সবজি আবাদের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু এবারের বন্যায় সে আবাদ গেছে ভেসে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাজার হাজার কৃষক। প্রায় দুই মাসব্যাপী দীর্ঘ বন্যায় দুর্গত এলাকার মানুষের একার পক্ষে বন্যাপরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে পারা সম্ভব নয়। এসব অঞ্চল মূলত কৃষিকেন্দ্রিক, তাই কৃষকের দুর্ভোগের শেষ নেই।

জামালপুরে দীর্ঘমেয়াদি বন্যায় কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় ধান, পাট, আখ, ভুট্টা, শাকসবজি, রোপা আমন ধানের বীজতলা নষ্ট হয়ে সারা জেলার কৃষকের প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ।

বন্যা উপদ্রুত জেলা নওগাঁয় মাছসহ অন্যান্য ফসলের ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। জেলার রাণীনগর, আত্রাই ও মান্দা উপজেলায় ৯টি স্থানে বাঁধ ভেঙে প্রায় ৪০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় ভেসে গেছে কয়েক শ পুকুরের কোটি কোটি টাকার মাছ। জেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা মান্দা, আত্রাই ও রাণীনগরে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়রা ধান লাগানোর পাশাপাশি কৃষি বিভাগের পরামর্শে বাড়ির উঠানে সবজি চাষ শুরু করেছেন।

এদিকে, চলতি বছরে তিন দফা বন্যায় গাইবান্ধা জেলার ছয়টি উপজেলার ১৪৪ কোটি ২৪ লাখ টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ। কিন্তু তার পরও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন কৃষকরা।

গাইবান্ধা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ কে এম ইদ্রিস আলী জানান, এছাড়া কৃষি ও মত্স্য খাতসহ বন্যায় মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১৪৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

বন্যা ও ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতির পরিমাণ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ম পর্যায়ে ২৫ জুন হতে ৯ জুলাই ২০২০ পর্যন্ত অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও নদনদীর পানি বৃদ্ধির কারণে বন্যায় রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, জামালপুর, নেত্রকোনা, রাজশাহী, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল জেলাসহ মোট ১৪টি জেলায় ১১টি ফসলের প্রায় ৭৬ হাজার ২১০ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়। যার মধ্যে ৪১ হাজার ৯১৮ হেক্টর জমি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২য় পর্যায় ১১ জুলাই হতে ১৯ জুলাই ২০২০ পর্যন্ত মানিকগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল, নাটোর, নওগাঁ, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, ময়মনসিংহ, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, শেরপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ মোট ২৬টি জেলায় ১৩টি ফসলের প্রায় ৮৩ হাজার হেক্টর আক্রান্ত হয়।

এদিকে, ২০ মে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী ও কাশিমাড়ী ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ ভেঙে ২১ গ্রাম প্লাবিত হয়। প্লাবিত ইউনিয়নের ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। অপর দিকে, গত ২০ আগস্ট মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে অতিবর্ষণ ও নদীতে অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, কাশিমাড়ী ও রমজান নগর ইউনিয়নের পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ও আম্ফানের ক্ষতিগ্রস্ত বিকল্প রিংবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি ভেতরে ঢুকে ইউনিয়নগুলো প্লাবিত হয়। এ সময় চিংড়িসহ মাছের ঘের ভেসে যাওয়ায় প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।