ক্যাসিনো কাণ্ডের এক বছর

জামিনে মুক্ত অনেকেই

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:২৩

২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর প্রথম দিনই রাজধানীর ফকিরাপুলের ইয়াংমেনস ক্লাবে অভিযান চালানো হয়। ঐদিন সন্ধ্যায় গুলশানের বাসা থেকে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়াকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর ৬ অক্টোবর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের সীমান্ত এলাকা থেকে র্যাব গ্রেফতার করে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে। সম্রাটের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে রাজধানীর ক্লাব কেন্দ্রিক ক্যাসিনোকাণ্ডের কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজির তথ্য বেরিয়ে আসে। এসব ঘটনায় দায়ের করা হয় মোট ৩২টি মামলা। এর মধ্যে গত এক বছরে মাত্র ২০টি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া অনেক আসামি দেশে ফিরে জামিন নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

এই ক্যাসিনোকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসে গণপূর্তের ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের টেন্ডার বাণিজ্যের খবর। গ্রেফতার হন মোহামেডান ক্লাবের পরিচালক মো. লোকমান হোসেন ভুঁইয়া, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ক্যাসিনো পরিচালনাকারী এনামুল হক আরমান, কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি মোহাম্মদ শফিফুল আলম ফিরোজ, অনলাইন ক্যাসিনোর প্রধান সমন্বয়কারী সেলিম প্রধান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান, মোহাম্মদপুরের ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব ও ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা ময়নুল হক ওরফে মনজু। ক্যাসিনো অভিযান শুরুর পর অনেকেই গা ঢাকা দেন। কেউ কেউ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভারতে আত্মগোপন করেন।

সূত্র জানায়, প্রায় তিন মাস ধরে ক্যাসিনোবিরোধী মোট ৪৯টি অভিযান পরিচালিত হয়। এর মধ্যে ৩২টি র্যাব এবং ১৭টি অভিযান পুলিশ পরিচালনা করে। এসব অভিযানে ২৭৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় ২২২ জন এবং ঢাকার বাইরে ৫৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময়ের মধ্যে ১১টি ক্যাসিনো ও ক্লাবে অভিযান চালিয়েছে র্যাব।

ক্যাসিনোকাণ্ডে আলোচিত ক্লাবগুলো হলো ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাব, মতিঝিলের ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র, কলাবাগান ক্রীড়াচক্র, ধানমন্ডি ক্লাব, ফু-ওয়াং ক্লাব, চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব, আবাহনী ক্লাব, মোহামেডাম ক্লাব এবং বনানীর গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ। এরপর আরো বেশ কয়েকটি ক্যাসিনোতে অভিযান পরিচালনা করা হয়।

অভিযান শেষ হওয়ার পরে দেশে ফেরেন যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদ, কেন্দ্রীয় সদস্য মিজানুর রহমান, ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সভাপতি শেখ রবিউল ইসলাম সোহেল, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রের ইজারাদার আলী আহমেদ ও গুলিস্তান এলাকার দেলোয়ার হোসেন ওরফে দেলুসহ অন্তত ৩০-৩৫ জন। অভিযানে গ্রেফতার হওয়া কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ ও মোহামেডান ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন ভুঁইয়া জামিনে বেরিয়ে গেছেন। বাংলাদেশ ফিন্যানসিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক দপ্তর সম্পাদক আনিসুর রহমান ও সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের ব্যাংক হিসাব তলব করে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তিন সংসদ সদস্যসহ ২৩ জনের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

এসব অভিযানে ৮ কোটি ৪৫ লাখ নগদ টাকা, ১৬৬ কোটি টাকার এফডিআর, ১৩২টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই এবং ১১ কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক জব্দ করা হয়। এছাড়া আট কেজি স্বর্ণ, ২২টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ ও ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় দায়ের করা ৩২টি মামলার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ১৪টি মামলার তদন্ত করে র্যাব। এর মধ্যে ১৩টি মামলার চার্জশিট আদালতে প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া এখনো একটি মামলা তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া বাকি ১৮টি মামলা তদন্ত করে পুলিশ। এর মধ্যে সাতটি মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে তারা। এর মধ্যে  গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনু ও যুগ্মসাধারণ সম্পাদক রুপন ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের পাঁচটি মামলার মধ্যে চারটির চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির ডিআইজি (অর্গানাইজড ক্রাইম) ইমতিয়াজ আহমেদ জানিয়েছিলেন, এনু-রুপনের কাছ থেকে জমিসহ ২০টি বাড়ি, ১২০টি ফ্ল্যাট, ২৫ কাঠা জমি ছাড়াও ৯১টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ১৯ কোটি টাকা পাওয়া গেছে।

র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ গতকাল বলেন, ক্যাসিনো অভিযানের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে ১৩টি মামলায় চার্জশিট দিয়েছে র্যাব। একটি মামলার তদন্ত চলছে। শিগিগর চার্জশিট দেওয়া হবে।