আগামী এক বত্সরে করদাতার সংখ্যা কমপক্ষে ১ কোটি করিতে চাহে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর); কিন্তু সেই লক্ষ্য কি পূরণ হইবে? বর্তমানে করদাতার সংখ্যা ৫০ লক্ষ। এই ৫০ লক্ষ লোকের টিআইএন (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) থাকিলেও বার্ষিক রিটার্ন জমা দেন মাত্র ২২ লক্ষ। এই জন্য এই ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হইল, একদিকে টিআইএন বাড়ানো, অন্যদিকে রিটার্ন সংখ্যাও বৃদ্ধি করা। সরকার করের হার কমাইয়া হইলেও অধিক লোককে করের আওতায় আনিতে চাহে। এই জন্য চলতি বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণি ও কোম্পানি—উভয় ক্ষেত্রে কমানো হইয়াছে করের হার। ইহার সহিত করসীমায় ছাড় দেওয়া হইয়াছে; কিন্তু বিশেষ করিয়া কোম্পানির ক্ষেত্রে কি আয়কর দেওয়ার প্রবণতা বাড়িতেছে? গত শুক্রবার প্রকাশিত ইত্তেফাকের একটি খবরে বলা হইয়াছে যে, ৯৮ হাজার ৪০০ কোম্পানির এখন পর্যন্ত টিআইএন নাই। ইহা কীভাবে সম্ভব? সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ হইতে নিবন্ধন লইয়া কোম্পানি হিসাবে পরিচালিত হইতেছে অথচ করদাতা শনাক্তকরণ নাম্বার নাই! ভাবিতেই অবাক লাগে!
যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের (আরজেএসসি) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ৭৬ হাজার। এই সকল কোম্পানির মধ্যে টিআইএন রহিয়াছে ৭৫ হাজার। আবার এই ৭৫ হাজার টিআইএনধারী কোম্পানির মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করে ৩৫ হাজার। আমরা জানি, আয়কর রিটার্ন দাখিল করিবার মানেই কর দেওয়া নহে। আয়করযোগ্য হইলেই কেবল কর দেওয়ার বিধান রহিয়াছে। যাহাদের টিআইএন নাই, তাহাদের সহিত দ্রুত যোগাযোগ করিয়া টিআইএন ইস্যু করা বাঞ্ছনীয়। (তবে চিহ্নিত প্রায় ১ লক্ষ কোম্পানির মধ্যে সকলেই যে কার্যক্রমে আছে তাহা নহে।)
বাংলাদেশে জনসংখ্যা ১৬ কোটিরও অধিক। তাহার মধ্যে সরাসরি করদাতার সংখ্যা এত কম হইবে কেন? জনসংখ্যা অনুপাতে দেশে ব্যক্তি করদাতার সংখ্যা কম হওয়াটা দুঃখজনক। অবশ্য এই দেশে মায়ের গর্ভে থাকা শিশুও সরকারকে কর দেয়। ইহা হইল ভ্যাটসহ অন্যান্য অপ্রত্যক্ষ কর। এই পরোক্ষ করনির্ভরতা হইতে আমাদের যথাসম্ভব সরিয়া আসিতে হইবে। কেননা, ইহা সুষম উন্নয়নের প্রতিবন্ধক। জানামতে, ২০২৪ সালের মধ্যে আমাদের প্রত্যক্ষ কর হইতে মোট রাজস্বের ৫০ শতাংশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা রহিয়াছে। ২০১৮-১৯ অর্থবত্সরে আয়কর হইতে আসিয়াছে মোট রাজস্বের ৩২ শতাংশ। এই জন্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা খুব কঠিন হইবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও আমাদের করদাতার সংখ্যা বাড়াইবার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখিতে হইবে। প্রতিটি উপজেলায় স্থাপন করিতে হইবে রাজস্ব দপ্তর। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়ন হইয়াছে বিধায় ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় খাতের কর আদায় বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হইয়াছে। আয়কর রিটার্ন দাখিলকে সহজ, আধুনিকীকরণ ও হয়রানিমুক্ত করিয়া এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা প্রয়োজন। আমরা মনে করি, দেশের নাগরিক হিসাবে টিআইএন থাকা একটি গর্বের বিষয়। দুনিয়ার সকল উন্নত দেশেই আয়কর দেওয়ার সুন্দর সংস্কৃতি বিরাজমান। সুনাগরিক হওয়ার পূর্বশর্ত হইল নিজে নিয়মিত আয়কর দেওয়া এবং অন্যকে উত্সাহিত করা। তাই এক্ষেত্রে জাগরণ সৃষ্টি করিতে হইবে।
