মোহম্মদ শাহিন
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে জিনিয়া নামের পথশিশুর অপহূতের ঘটনা কারো অজানা নয়। জিনিয়া ঢাবি শিক্ষার্থীদের নিকট পরিচিত মুখ ছিল বলেই তার অপহূতের ঘটনা জানতে পেরে তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু জিনিয়ার মতো হাজারো পথশিশু রয়েছে আমাদের দেশে। তারাও প্রতিনিয়ত কোনো না কোনোভাবে প্রতারক চক্রের নিকট জিম্মি হচ্ছে। একটি শিশুর জন্মের পর প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে বড় হবে—এটাই কাম্য; কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আমাদের দেশে জিনিয়াদের মতো অসংখ্য শিশু রয়েছে—যাদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা তো দূরে থাক, বেঁচে থাকার ন্যূনতম চাহিদাটুকুও তাদের ভাগ্যে জোটে না। ফুটপাত, রেল স্টেশন কিংবা যে কোনো দালানের নিচে যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই, দুমুঠো ভাত খেতে যাদের ভিক্ষাবৃত্তির অবলম্বন করতে হয়, সেখানে আজ আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র তাদের নিয়ে কতটুকু ভাবতে পারছি—তা প্রশ্নবিদ্ধ। এসব শিশুর অনেকেই জানে না তাদের বাবা-মার পরিচয়। অনেকের বাবা-মার মধ্যে একজন আছে। কিন্তু এসব অভিভাবকও তাদের ভরণপোষণ করতে সক্ষম নয়। তাই, নিয়তির করুণ ইতিহাস মেনে নিয়ে নিরাপত্তাহীন অন্ধকার জগতের নিমিত্তে পা বাড়াতে হয় তাদের। যে বয়সে আমাদের সন্তান পড়ালেখা ও খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত, সেই বয়সে এই শিশুরা জীবনের উপকরণ খুঁজতে ব্যস্ত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান অধিদপ্তর ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল সংস্থা ইউনিসেফের তথ্যমতে—আমাদের দেশে পথশিশু রয়েছে ১০ লাখ। তবে শুধু ঢাকা শহরেই রয়েছে ৬ লাখ। এ সংখ্যা যে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে তা সহজেই অনুমেয়।
আজ স্বাধীনতার পঞ্চম দশক ছুঁই ছুঁই; স্বাধীনতার এত বছর পরে এসেও কি আমরা এই শিশুদের স্বাধীনতার সুফল নিশ্চিত করতে পেরেছি? আন্তর্জাতিক শিশু সনদ, শিশু আইনসহ দেশের প্রচলিত আইনে প্রতিটি শিশু তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ লাভে খাদ্য, শিক্ষা ও বিনোদন পাবার অধিকার রাখে। এমনকি শিশুর নির্যাতন ও বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে আত্মরক্ষার কথাও উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু আমরা কি আদৌ এই শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে পারছি? এগুলো ভীষণ বৈষম্য নয় কী ? এক দিকে যেমন এই শিশুরা প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অপর দিকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন, নিগ্রহ ও অপহরণের স্বীকারও হচ্ছে। শহরাঞ্চলের বিভিন্ন প্রতারক চক্র এই শিশুদের ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নিয়োগ করছে, মেয়েদের গড়ে তুলছে যৌনকর্মী হিসেবে।
আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যত্ নামের যে বুলি সবাই আওরায়; তা বাস্তবায়নে এই শিশুগুলোর ভবিষ্যত্ নিশ্চিত জরুরি। আজ যে শিশুটি রাস্তায় খাচ্ছে, রাস্তায় ঘুমাচ্ছে তাদের কোনো দোষ নেই—ভাগ্যই আজ তাদের এপর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এদের মধ্যেও রয়েছে অপার সম্ভাবনা। তারাও স্কুলে যেতে চায়, যোগ্য নাগরিক হতে চায়, দেশের জন্য ফলপ্রসূ কিছু করতে চায়। তাদের জন্য দরকার শুধু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। আমাদের দেশে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন সংগঠন পথশিশুদের খাবার, শিক্ষা, খেলাধুলা এবং বিনোদনের ব্যবস্থা করছে কিন্তু এসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদি কোনো উপকার করে না। দিনশেষে তাদের পথেই ফিরে যেতে হয়। ব্যক্তি উদ্যোগে হয়তো দুই-একজনকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যাবে কিন্তু এই ১০ লাখ শিশুকে সুস্থ, স্বাভাবিক ও ন্যূনতম চাহিদার যোগান দিতে হলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বিকল্প নেই। এখনই মোক্ষম সময় এই শিশুদের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার, অন্যথায় আগামীতে এই শিশুরাই দেশ ও জাতির জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়াবে। পথশিশুদের নিয়ে সার্ভে করে যাদের অভিভাবক নেই তাদের অবশ্যই এতিমখানাতে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যাদের অভিভাবক রয়েছে কিন্তু দারিদ্র্যপীড়িত, তাদেরও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মমুখী খাতে এদের নিয়োগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীদের সহায়তা নিয়ে তাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরিয়ে আনতে হবে। এই অসহায় শিশুগুলোর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রকে এটাও নিশ্চিত করতে হবে যেন নতুন করে আর কোনো শিশু, পথশিশু হিসেবে পরিচয় না পায়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
