জোয়ারভাটার বৃত্তে বাঁধা কুতুবদিয়ার জনজীবন

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:২৩

টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রতি জোয়ারে ডুবছে দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার কয়েক শ ঘরবাড়ি। জোয়ার-ভাটার বৃত্তে বাঁধা পড়ে গেছে লাখো মানুষের জীবন। প্রায় শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য ১৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অর্ধেক কাজও আড়াই বছরেও শেষ করতে না পারায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। প্রকল্পের প্রথম মেয়াদ শেষ হলেও কাজ শেষ না হওয়ায় আতঙ্ক ভর করে আছে দ্বীপবাসীদের ওপর। দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে দ্রুততম সময়ে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন করার দাবিতে কক্সবাজারের তরুণদের সংগঠন ‘উই ক্যান’ এর উদ্যোগে সম্প্রতি দ্বীপের উত্তর ধুরুংয়ের কায়ছারপাড়া ভাঙন এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন ঘরবাড়ি হারানো মানুষ।

উই ক্যানের প্রতিষ্ঠাতা ওমর ফারুক জয়ের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধন থেকে বলা হয়, বিগত ২০১২ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলা ও পরবর্তীকালে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু, মোরা এবং সম্প্রতি আম্ফানের আঘাতে কুতুবদিয়া উপকূলের কাইছারপাড়া, নয়াকাটা, পশ্চিম চরধুরুং, পূর্ব চরধুরুং, পূর্ব তারলেররচর, আনিচের ডেইলসহ আরো কয়েকটি এলাকায় প্রায় ১৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত। দ্বীপের ৪০ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে                  ২০ কিলোমিটার অরক্ষিত। অমাবস্যা আর পূর্ণিমার সময় সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলেই ভাঙা বাঁধ এলাকার গ্রামগুলোতে জোয়ার-ভাটার খেলা চলে। এ সময় লাখো দরিদ্র মানুষের পক্ষে ঘরে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনাবাদি থেকে যায় হাজারো একর ফসলি জমি। পানি উন্নয়ন বোর্ড অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ মেরামতে ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও গত আড়াই বছরে এক-তৃতীয়াংশ কাজও শেষ করতে পারেনি ঠিকাদার। ফলে সাত বছর ধরে ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে লক্ষাধিক মানুষ।

উত্তর ধুরুং এলাকার হাসান মাহমুদ সুজন বলেন, জোয়ারের পানিতে ঘর-আঙিনা, পুকুর-ভিটা সব ভেসে যাচ্ছে। পানি আর বায়ুবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। বর্ষায় হাজার হাজার একর জমি অনাবাদি থেকে যায়। শুস্ক মৌসুমেও হাজার একর লবণমাঠ অনাবাদি পড়ে থাকে। বিগত সাত বছরে এসব এলাকার প্রান্তিক চাষিদের কয়েক শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে।

উত্তর ধুরুং ইউপির চেয়ারম্যান আ স ম শাহরিয়ার চৌধুরী জানান, চরধুরুং, আকবরবলীপাড়া, ফয়জানিরবাপের পাড়া, সতরউদ্দিন, কাইছারপাড়া এলাকায় সাত কিলোমিটার বাঁধ না থাকায় এসব এলাকা দিয়ে সাগরের পানি ঢুকে বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়। লোকজন জোয়ারের পানি ঠেকাতে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে মাটি কেটে রিং বাঁধ দিলেও তা অল্প দিনেই বিলীন হয়ে যায়।

কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চেধুরী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে জোয়ারের পানি উপচে পড়ায় বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জোয়ার-ভাটার দোলাচলে দুলছে উপজেলার বেশির ভাগ এলাকা। এতে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে উপজেলার প্রায় ২ লাখ মানুষ। সরকার অর্থ বরাদ্দ দিলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বেড়িবাঁধের সংস্কারকাজ সময়মতো শেষ না হওয়ায় জোয়ারের পানি থেকে দ্বীপবাসী মুক্তি পাচ্ছে না।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী জানান, কুতুবদিয়ায় প্রায় ১৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সংস্কার ও নির্মাণের জন্য ২০১৭ সালে প্রায় ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে চলমান কাজটির কার্যাদেশ ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গত জুন মাসে কাজটি শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু মাটি প্রস্তুত এবং নানা উপকরণ তৈরির জন্য পর্যাপ্ত স্থানের অভাবে কাজে ব্যাঘাত ঘটে। ডিপিপি পরিবর্তন হয়েছে, অক্টোবরে শুষ্ক মৌসুম শুরু হলে পুরোদমে কাজ চলবে। স্বল্প সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলোর সংস্কার ও নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যায়।

কুতুবদিয়া-মহেশখালী আসনের সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক বলেন, কুতুবদিয়ায় বাঁধ ভাঙনের সমস্যা কয়েক যুগের। শুষ্ক মৌসুমে মেরামত হওয়া বাঁধ বর্ষায় বিলীন হয়ে ভোগান্তি বাড়ায়। টেকসই বাঁধ নির্মাণের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর এখন কাজ চলমান রয়েছে। এটি বাস্তবায়নে নিয়মিত তদারক করা হচ্ছে । 

এদিকে বিভিন্ন সমীক্ষায় বলা হয়, প্রতি ২ সেন্টিমিটার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে উপকূলীয় তটরেখা গড়ে দুই-তিন মিটার স্থলভাগের দিকে অগ্রসর হলে ২০৩০ সাল নাগাদ মূল ভূখণ্ডের ৮০ থেকে ১২০ মিটার পর্যন্ত অতিক্রম করবে এবং কালক্রমে দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া ও কক্সবাজার সৈকত সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। এমনটি হলে হারিয়ে যাবে পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার।