ইসরাইল ও ফিলিস্তিনির জন্য ‘দুই-রাষ্ট্র সমাধান’ এখন যেন অন্ধগলিতে পথ খুঁজিয়া মরিতেছে। গত এক মাসে দুই দফায় নূতন করিয়া ফিলিস্তিনের ভাগ্যাকাশে আঁধার জমিয়াছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, টু স্টেট সলিউশনের পরিবর্তে ওয়ান স্টেট সলিউশনই এখন ‘ডি ফ্যাক্টো’ হইয়া যাইতেছে। কারণ, গত শুক্রবার উপসাগরীয় দেশগুলির মধ্যে ইসরাইলের সহিত সর্বশেষ সম্পর্ক স্বাভাবিক করিতে সম্মতি জানাইয়াছে বাহরাইন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করিয়া অনেকে মনে করিতেছেন—মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমশ প্রভাবশালী হইয়া উঠা ইরানকে ঠেকাইতে সৌদি আরবের মিত্রদেশ হিসাবে পরিচিত বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তেল আবিবের সহিত হাত মিলাইল। সর্বশেষ গত শুক্রবার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং বাহরাইনের বাদশা হামাদ বিন ইসা বিন সালমান আল-খালিফার মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বাহরাইন ও আমিরাতের পূর্বে ইসরাইলের সহিত সম্পর্ক স্বাভাবিক করিয়াছে মিশর ও জর্দান। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর হইতে গত শুক্রবারের পর এখন অবধি চারটি আরব রাষ্ট্র ইসরাইলকে স্বীকৃতি প্রদান করিল। অনেকে মনে করিতেছেন, ইসরাইলের সহিত শান্তিচুক্তি করা সৌদি আরবের জন্যও এখন ‘শুধু সময়ের ব্যাপার’। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, ইহাতে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের দাবিতে কয়েক দশক ধরিয়া সংগ্রাম চালাইয়া যাওয়া ফিলিস্তিনিরা আরো বিপাকে পড়িয়াছে। এই কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলিকে ট্রাম্প যতই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলিয়া মনে করুন না কেন—বাস্তবে ইহা ফিলিস্তিনিদের জন্য একধরনের বিশ্বাসঘাতকতা। আমরা দেখিতেছি, বহু বত্সর ধরিয়া মৃত্যু উপত্যকা ফিলিস্তিনে ‘সবার উপরে যুদ্ধ সত্য’—অবস্থা সৃষ্টি করিয়াছে ইসরাইল। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর হইতেই স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রাম শুরু হয়। ১৯৮৮ সালের ১৫ নভেম্বর দেশটির সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত হয়। তবে অনেক রক্তনদী সৃষ্টি হইলেও আজও ফিলিস্তিনের সেই স্বপ্ন পূরণ হয় নাই। আর তাহা পূরণ না করিতে যাহা যাহা করা দরকার, যেই সকল কৌশল অর্জন করা দরকার—তাহার সকল কিছুই করিয়া যাইতেছে ইসরাইল। ছোট্ট ভূখণ্ড ফিলিস্তিনের গাজার পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণ-পশ্চিমে মিশর আর উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে ইসরাইল; কিন্তু ভৌগোলিকভাবে ফিলিস্তিন দেশটি কোণঠাসা হইতে হইতে এখন দুইটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে পরিণত হইয়াছে। একটি গাজা, অপরটি পশ্চিম তীর। ১১ কোটি ফিলিস্তিনির প্রায় সাড়ে ৪ কোটি কোনো রকমে গাজা ভূখণ্ডে এবং পশ্চিম তীরে বসবাস করিতে পারিতেছে, বাকিরা উদ্বাস্তু হইয়া আশ্রয় লইয়াছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। বিস্ময়ের কথা হইল, ইসরাইলের পক্ষাবলম্বী বিশ্বের সিংহভাগ শক্তিশালী গণমাধ্যমে এই সকল নৃশংসতাকে দেখানো হয় ভিন্ন চোখে। এই সকল মিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ইতিহাসে সর্বাধিক ‘সংযত’ দেশ হিসাবে ইতিমধ্যেই নিজেকে নাকি প্রতিষ্ঠিত করিয়া ফেলিয়াছে ইসরাইল!
তবে কি ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার অমরাবতী চিরকাল অধরাই থাকিয়া যাইবে? ইতিহাসের দিকে তাকাইলে ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘বাংলাদেশ’-এর উদাহরণ একটি সান্ত্বনা হইতে পারে বটে। ১৯৭১ সালে একমাত্র ভারত ও রাশিয়া ছাড়া বিশ্বের সকল পরাশক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষেই ছিল; কিন্তু তাহার পরও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন আটকানো যায় নাই। যদিও প্রতিটি স্বাধীনতাকামী ভূখণ্ডের জন্যই পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সময় ও পরিবেশ অনুযায়ী ভিন্ন হইয়া থাকে। তবে সেই ভিন্নতার ভিতরেই ফিলিস্তিনিরা ভবিষ্যতে তাহাদের স্বাধীনতার পথ তৈরি করিতেই পারে। শেষ বলিয়া কিছু নাই।
