মো. শহীদুল ইসলাম
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে দুই জন যুবরাজ নতুন খেলোয়াড় হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন। এক জন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, আরেক জন আবুধাবির তথা সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ মোহাম্মদ জায়িদ আল নাহিয়ান। গত ১৩ আগস্ট যুবরাজ নাহিয়ান ইসরাইলের সঙ্গে যে শান্তিচুক্তি করেছেন তা নজিরবিহীন। ১৯৭৮ সালে মিশর এবং ১৯৯৪ সালে জর্ডান ইসরাইলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিল। ইসরাইলের সঙ্গে দেশ দুটির সরাসরি স্বার্থ জড়িত ছিল। তথাপি মিশর প্রায় একঘরে হয়ে গিয়েছিল। বলতে গেলে কোনো রকম ছাড় দেওয়া ছাড়াই ইসরাইল পেল এক আরব মিত্র। ইসরাইল শুধু আপাতত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপন স্থগিত রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত এই চুক্তির মাধ্যমে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুর ভাটা পড়া জনপ্রিয়তা যেমন পুনরুদ্ধারের পথে কিছুটা হলেও সহযোগিতা করবে, একইভাবে আগামী নভেম্ব্বরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলি লবির সমর্থন নিশ্চিত করতে পারবেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইহুদি লবি যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু যুবরাজ নাহিয়ান কী পাবেন? তিনি যে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে শান্তির পথে এই চুক্তি সহযোগিতা করবে বলে মনে করেন, তা আদৌ কোনো শান্তি আনতে পারবে কি? নাকি ইসরাইলি দখলদারিত্বের বৈধতা দিয়ে তিনি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আরো অশান্তি ডেকে আনতে চান? এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে গাজা নিয়ন্ত্রণকারী হামাস, পশ্চিম তীর নিয়ন্ত্রণকারী ফাতাহ। এছাড়াও প্রতিবাদ হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়। কালবিলম্ব না করে চুক্তির বিরোধিতা করে নিন্দা জানিয়েছে ইরান, তুরস্ক, ইয়েমেন। এমনিতেই বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিভক্ত। তার ওপর ইসরাইলের সঙ্গে আমিরাতের এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে আরো বিভক্ত করবে। সর্বশেষ বাহরাইনও ইসরাইলের সঙ্গে চুক্তি করেছে এবং এর আগে মিশর ও জর্ডান ইসরাইলের সঙ্গে চুক্তি করে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে।
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের কর্তৃত্ববাদী শাসকরা বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। ক্ষমতার মসনদে যদি আঘাত আসে, এই ভয় তাদের ছিল। এমনই একটা পরিস্থিতিতে গঠিত হয়েছিল উপসাগরীয় সহযোগী সংস্থা (জিসিসি)। তারপর পেরিয়ে গেছে অনেক বছর। ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান পার করেছে ৪০ বছর। কিন্তু অতি সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানের উত্থান ঘটেছে। নানা রকম নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এখন অন্যতম প্রধান খেলোয়াড়। তাই শিয়া-সুন্নি তত্ত্বকে সামনে এনে সৌদি আরবের নেতৃত্বে চলছে ইরানকে দমানোর চেষ্টা। ২০১৬ সালে একজন শিয়া নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে আসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি কট্টর ইরানবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করে ইসরাইল একের পর এক স্বার্থ হাসিল করছে। প্রতিবারই ইরানের বিরোধিতার সম্মুখীন হচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবানন ও ইরাকের ওপর এখন ইরানের যথেষ্ট প্রভাব বিদ্যমান। ইসরাইল তার নিরাপত্তার জন্য ইরানকে প্রধান হুমকি মনে করে। শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু, এমন তত্ত্বই ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইরান বিরোধী দেশগুলোকে কাছাকাছি এনেছে। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার যিনি একজন ইহুদি, তিনিই ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ইসরাইল যেমন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র একইভাবে মিত্র আরবের বেশির ভাগ দেশ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে যতটা বিশ্বাস করে অন্যদের ততটা করে না। তাই প্রধান মিত্র ইসরাইলকে যতটা শক্তিশালী করা যাবে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে কর্তৃত্ব ততটা সহজ হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এমনিতে দ্বিধাবিভক্ত। সিরিয়া ইস্যুতে ইরান-তুরস্ক-সিরিয়া মৈত্রিতা। কাতার সংকটকে কেন্দ্র করে ইরান-তুরস্ক-কাতার মৈত্রিতা। ইয়েমেন সংকটে ইরান একপক্ষ, অপরদিকে হুতিদের দমনে বোমা বর্ষণ করছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট। লিবিয়া সংকটে জাতিসংঘ সমর্থিত সরকরের পক্ষে তুরস্ক ও কাতার, অপরদিকে যুদ্ধবাজ খলিফা হাফতারের পক্ষে মিশর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। লেবানন ইস্যুতেও সৌদি আরব বনাম ইরান দ্বন্দ্ব রয়েছে। ইরাকে এখন ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। দিন যত যাচ্ছে ইরান-তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণক হতে যাচ্ছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন উপসাগরীয় জোটে ত্রিধাবিভক্ত। সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্য এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
এভাবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত জিইয়ে রাখতে পারলে সব পক্ষের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্র। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রিসের সঙ্গে চলমান উত্তেজনায় আমিরাত এরই মধ্যে গ্রিসের পক্ষ নিয়েছে। একটা ভাবার বিষয় এই যে, আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে যদি জো বাইডেন নির্বাচিত হন, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ হতে পারে। জো বাইডেন ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিতে পুনরায় ফিরে আসতে চান। আমরা চাই ৭২ বছর ধরে চলমান ফিলিস্তিন সংকট শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সুবাতাস ফিরে আসুক।
n লেখক : শিক্ষার্থী, আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের ওপর স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
