দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে ক্লান্ত খুলনা উপকূলের লাখো মানুষ

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:৩৪

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে গেছে খুলনার উপকূলবাসীর জীবন। একটা দুর্যোগ কাটতে না কাটতেই আরেকটি দুর্যোগ এসে হাজির হয় সুন্দরবন উপকূলবাসীর সামনে। দুর্যোগ-দুর্বিপাকের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে এই জনপদের লাখো মানুষ। কিন্তু এত বেশি দুর্যোগ মোকাবিলা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন তারা। পাউবো নির্মিত বেড়িবাঁধ বার বার ভেঙে গিয়ে লোনা পানি ঢুকে পড়ছে জনপদে। ঘরবাড়ি প্লাবিত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে জমির ফসল। উপকূলে তাই একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এখন এই অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি।

সর্বশেষ প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আঘাত হানে সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায়। এর রেশ কাটতে না কাটতেই আবার মৌসুুুমি বায়ুর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে অতিবর্ষণ আর প্রবল জোয়ারের চাপে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোনা পানিতে প্লাবিত হয় কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়ন এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ।

গত ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী ও কাশিমাড়ী ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ ভেঙে ২১ গ্রাম প্লাবিত হয়। ইউনিয়নের অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে।

গত ২০ আগস্ট মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে অতিবর্ষণ ও নদীতে জোয়ারের পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, কাশিমাড়ী ও রমজাননগর ইউনিয়নের পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ও আম্ফানের ক্ষতিগ্রস্ত বিকল্প রিং বাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি ঢুকে ইউনিয়নগুলো প্লাবিত হয়। এ সময় চিংড়িসহ মাছের ঘের ভেসে যাওয়ায় প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। 

আম্ফানের আঘাতে কয়রা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে লোনা পানি প্রবেশ করে। জনপ্রতিনিধিদের চেষ্টায় ও এলাকাবাসীর স্বেচ্ছাশ্রমে তিনটি ইউনিয়নের বেড়িবাঁধে রিং বাঁধ দিয়ে পানি আটকানো সম্ভব হলেও উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের হাজতখালি বেড়িবাঁধের ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হয়নি। সেই থেকে ঘরবাড়ি হারিয়ে অতিকষ্টে বেড়িবাঁধের ওপর বসবাস করছে অসংখ্য মানুষ। এখন তাদের আয়ের কোনো সুযোগ নেই। নেই খাবার জন্য নিরাপদ সুপেয় পানি। ছোট ছোট কুঁড়ে ঘরে অতিকষ্টে তাদের দিন কাটছে। এলাকার যে ঘরগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে সেখানে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি।  তার ওপর মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে কপোতাক্ষ নদের পানির প্রবল চাপে গত ২০ আগস্ট সকালের জোয়ারে কয়রা সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর কয়রার বেড়িবাঁধের রিং বাঁধ ভেঙে লোকালয় লোনা পানিতে তলিয়ে যায়।

পাউবো সূত্র জানায়, কয়রা উপজেলায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ রয়েছে। এরমধ্যে ১৪/১ নম্বর পোল্ডারে ২৭.৩৭ কিলোমিটার ও ১৩/১৪/২ নম্বর পোল্ডারে ৯১.৯৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আছে। গত ২০ মে সুপার সাইক্লোন আম্ফানের তাণ্ডবে ৩৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এরমধ্যে ১৪/১ নম্বর ও ১৩/১৪/২ পোল্ডারের ২৫টি স্থান ভেঙে ৫.২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া ১২.৭ কিলোমিটার বাঁধ ধসে যায়। অপরদিকে, ৬৩টি স্থানে আংশিকভাবে ভেঙে ২১.১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে কয়রা উপজেলার সাত ইউনিয়নের মধ্যে কয়রা সদর ইউনিয়ন, উত্তর বেদকাশি, দক্ষিণ বেদকাশি ও মহারাজপুর ইউনিয়ন লবণ পানিতে প্লাবিত হয়। এছাড়া আম্ফানে দাকোপ উপজেলার ১০ হাজার ২৭৫টি পরিবারের ক্ষতি হয়। এখনো পর্যন্ত অনেকেই ঝড়ের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এছাড়া কয়েক কিলোমিটার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ওয়াপদা বেড়িবাঁধটি মেরামত হলেও এখনো সেটি রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়।

উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সরদার নূরুল ইসলাম বলেন, আজও পর্যন্ত আমরা লোনা পানি মুক্ত হইনি। এখনো আমরা পানিবন্দি আছি। আমরা ত্রাণ নয়, টেকসই বাঁধ চাই। টেকসই বাঁধ হলেই আমরা বেঁচে থাকতে পারব।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, কয়রা উপজেলার মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে পাউবোর ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ। এখন প্রয়োজন জরুরিভিত্তিতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ। এটি নির্মাণ হলে কয়রার মানুষের আর জমি-ঘর প্লাবিত হবে না। লবণ পানিতে ফসলেরও কোনো ক্ষতি হবে না।