মনীষী

‘নিসর্গ সখা’ দ্বিজেন শর্মা

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৯:৪১

আবদুল্লাহ আল মোহন

 

তাঁর সঙ্গে রমনা পার্কসহ বিভিন্ন উদ্যানে গিয়ে গাছ চেনার-দেখার সুযোগ হয়েছে অনেকবার।

পাহাড়ে বাস করলে আমরা কেমন জীবনযাপন করব, সমতলের মানুষ কীভাবে থাকবে আর বনের মানুষের জীবনই বা কী হবে, তা প্রকৃতিই নির্ধারণ করে। তাই প্রকৃতিকে উপেক্ষা করলে স্বাভাবিক জীবন উপেক্ষিত হবে। এই জীবন যেন উপেক্ষিত না হয় সেই সচেতনতা সৃষ্টিরই প্রয়াস চালিয়ে গেছেন দ্বিজেন শর্মা। ছিলেন নিভৃতিচারী, উদ্ভিদবিদ, বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষাবিদ। তাঁর মধ্যে ছিল শিল্পবোধ আর দেখার চোখ, সুন্দরকে অন্বেষণের আকাঙ্ক্ষা।

রবি ঠাকুরের প্রকৃতি-প্রেম নিয়ে অনেক কথাই শুনেছি তাঁর মুখে। একটি উদাহরণ তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না, যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলছেন, ‘এই যে বাংলাদেশ ইহার মৃত্তিকা, ইহার জল, ইহার বায়ু, ইহার আকাশ, ইহার বন, ইহার শস্যক্ষেত্র লইয়া আমাদিগকে সর্বতোভাবে বেষ্টন করিয়া আছে...আমরা যেন ভালোবাসিয়া তাহার মৃত্তিকাকে উর্বর করি, তাহার জলকে নির্মল করি, তাহার বায়ুকে নিরাময় করি, তাহার বনস্থলীকে ফলপুষ্পবতী করিয়া তুলি, তাহার নরনারীকে মনুষ্যত্ব লাভে সাহায্য করি।’

দ্বিজেন শর্মার বাবা চন্দ্রকাণ্ড শর্মা ছিলেন ভিষক, যাকে বলে কবিরাজ। আর মা মগ্নময়ী দেবী ছিলেন সমাজসেবী। শৈশবে পাথারিয়া পাহাড়ের জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছেন অনেক। সেখান থেকেই গাছপালার প্রতি জন্মে তাঁর অসীম ভালোবাসা। জীবিকার তাড়না জীবনকে যেখানেই নিয়ে যাক, দ্বিজেন শর্মা নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন প্রাণ ও প্রকৃতির স্বরূপ সন্ধানে। উদ্ভিদ জগত্, প্রকৃতিবিজ্ঞান আর বিজ্ঞান ভাবনা নিয়ে লিখেছেন বই—‘ফুলগুলি যেন কথা’, ‘শ্যামলী নিসর্গ’, ‘হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ড্যালটন হুকার’, ‘কুরছি তোমার লাগি’, ‘প্রকৃতিমঙ্গল’, ‘চার্লস ডারউইন ও প্রজাতির উত্স’, ‘বিজ্ঞান ও শিক্ষা দায়বদ্ধতার নিরিখ’ ইত্যাদি। তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘জীবনস্মৃতি : মধুময় পৃথিবীর ধূলি’।

দ্বিজেন শর্মা রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় নানা প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন, তৈরি করেছেন উদ্যান ও বাগান। গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণ এবং প্রকৃতিবান্ধব শহর গড়ার জন্য আজীবন প্রচার চালিয়ে গেছেন। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি একদিন থাকব না, কিন্তু গাছগুলো থাকবে। মানুষকে অক্সিজেন বিলাবে। জীবনে এর চেয়ে আনন্দ আর কিছুতে নেই।’

নিসর্গের সঙ্গে গড়ে তুলেছিলেন নিবিড় সখ্য। আমৃত্যু ভালোবেসেছেন বৃক্ষের সবুজ সজীবতা। চেয়েছিলেন প্রকৃতির সঙ্গে গড়ে উঠুক মানুষের সহাবস্থান। সে প্রত্যাশায় উচ্চারণ করেছিলেন, ‘মানুষ, বৃক্ষের মতো আনত হও, হও সবুজ।’