রতন মালো
মাত্র ২৯ বছরের এক তরতাজা ছিপছিপে গড়নের আমেরিকার যুবক ১৯৫২ সালে বাংলাদেশে (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) আসেন পশ্চাত্পদ ও দরিদ্র দেশটির মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও সেবা দেওয়ার এক মহান চিন্তা মাথায় নিয়ে। কিন্তু যে সমাজে তিনি থাকবেন, যে সমাজের মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করবেন, সেই ভাষা জানা তো অতি জরুরি। তাই বাংলা ভাষাটিও শিখে নেন খুব দ্রুত। একটা-দুইটা বছর নয়, এদেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবেসে জীবনের প্রায় ৭০ বছর বাংলাদেশে কাটিয়ে দেন ক্যাথলিক মণ্ডলীর হলিক্রস সম্প্রদায়ের মিশনারি ফাদার টিম।
প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এই বদ্বীপ রাষ্ট্রের মানুষের দুর্ভোগের সীমা ছিল না। তার ওপর ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অনবরত অত্যাচার ও নিপীড়ন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাঙালির ওপর পাকিস্তানিদের নিষ্ঠুর বর্বরতা, গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন ফাদার টিম। তিনি নিশ্চুপ ছিলেন না। বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার তীব্র বিরোধিতা করেন। এখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বর্বরতার সংবাদ পাঠান, বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালান। পাকিস্তানি বাহিনীর অবর্ণনীয় নৃশংসতার কথা লিখে পাঠান ওয়াশিংটনে। জর্জ হ্যারিসন, পণ্ডিত রবিশংকরের মতো ফাদার টিমও বাংলাদেশের ওপর ঘটে যাওয়া বর্বরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার তাগিদ অনুভব করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তার সেই অবদান বাংলাদেশ স্মরণ করে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাকে দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা পদক।
পুরো নাম ড. ফাদার রিচার্ড উইলিয়াম টিম, সিএসসি। জন্মগ্রহণ করেন আমেরিকার ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের মিশিগান সিটিতে ১৯২৩ সালের ২ মার্চ। ১৯৪৯ সালের ৬ জুন ক্যাথলিক যাজক হিসেবে অভিষিক্ত হন। তার পরেও পড়াশোনা চালিয়ে যান। ১৯৫১ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব আমেরিকা থেকে জীববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি সমাপ্ত করেই ফাদার টিম পাড়ি জমান বাংলাদেশে (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে)।
বাংলাদেশে কর্মজীবনের শুরুতেই ঢাকার সনামধন্য নটর ডেম কলেজে অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন ফাদার টিম। হাজারো তরুণকে বিজ্ঞানমনস্ক করতে মনোযোগী হন আমেরিকান এই যুবক। নটর ডেম কলেজে তিনিই শুরু করেন বিতর্ক ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব ও অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব। বাংলাদেশের চরম সংকটের সময় ১৯৭০ ও ১৯৭১ সালে ফাদার টিম নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়, ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিপদগ্রস্ত বাঙালির পাশে দাঁড়ান ফাদার টিম। ১৯৮৮ ও ’৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায়ও ফাদার টিম নটর ডেম কলেজের ছাত্রদের নিয়ে চলে যান ভোলার মনপুরা দ্বীপে। ঘূর্ণিঝড়কবলিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান বাঙালির ফাদার টিম ও তার স্বেচ্ছাসেবী ছাত্ররা। ঢাকা কারিতাসের মাধ্যমেও তিনি মানবতার সেবায় এগিয়ে আসেন। যত দিন বাংলাদেশে ছিলেন, প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগেই মানুষের কল্যাণে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন ফাদার টিম।
সমাজ উন্নয়নে অবদান ও তার বিশ্বজ্ঞানের কারণে ১৯৮৭ সালেই তিনি লাভ করেন এশিয়ার নোবেল খ্যাত ‘র্যামন মাগসেসে’ পুরস্কার। সামাজিক ক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষায় অবদানের জন্য একই বছর লাভ করেন আবু সায়েদ চোধুরী পুরস্কার। বাংলাদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তার অসংখ্য ছাত্র। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জীববিজ্ঞানী ফাদার টিম ছিলেন ছাত্রপ্রিয় শিক্ষক। জ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান, বিনয়ী, সহজ-সরল ফাদার টিম অনেকেরই অনুপ্রেরণা। বাংলার অকৃত্রিম বন্ধু ফাদার টিম গত ১১ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টা ২০ মিনিটে নিজ দেশ আমেরিকার ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের নটর ডেম ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৯৭ বছর বয়সে।
তারই প্রচেষ্টায় মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়াতে অতুলনীয় অবদান রাখে কারিতাস বাংলাদেশ। বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ফাদার টিম ইহজগত্ ত্যাগ করলেও বাঙালির হূদয়ে থাকবেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে। অসংখ্য মেধাবী ছাত্রের শিক্ষক টিম। সেই সব ছাত্র আজ প্রিয় শিক্ষককে হারিয়ে অশ্রুসিক্ত। ব্যক্তি টিম ছিলেন অজাতশত্রু।
কারিতাস বাংলাদেশ ফাদার টিমের আত্মজীবনীমূলক একটি বই ‘Forty Years in Bangladesh :Memories of Father Timm’ প্রকাশ করে। ফাদার টিম বিজ্ঞানবিষয়ক অসংখ্য বই লিখেছেন, যেগুলো বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের কাছে এখনো মূল্যবান। বাংলাদেশে এসে মানবতার সেবায় জীবন নিবেদনকারী ফাদার টিম আমাদের কাছে এক অনন্য উদাহরণ। ভিনদেশি একজন নাগরিক হয়েও ফাদার টিম ছিলেন মনেপ্রাণে বাঙালি। এ এক জটিল রসায়ন। কোনো কোনো মহান মানুষ এমনই হন। নিজ ভূমি, নিজ সমাজ ছেড়ে কোনো এক অচেনা সম্প্রদায়ের জন্য নিজের জীবন সমর্পণ করেন। ফাদার টিমও তাদের একজন। টিম দেহত্যাগ করেছেন, কিন্তু তার শিক্ষা, তার আদর্শ ও মানবদরদ যেন মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।
n লেখক :ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট ও এনজিও কর্মী
