করোনা মোকাবিলায় সবজির ভূমিকা

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৫৯

ড. ফেরদৌসী ইসলাম আইভী

বাংলাদেশ সবজি উত্পাদনের আওতায় জমির পরিমাণ বৃদ্ধিতে প্রথম এবং একক জমিতে উত্পাদন বৃদ্ধির হারে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে ওঠার সাফল্য অর্জন করলেও দেশের মানুষের এখনো দৈনিক যে পরিমাণ সবজি গ্রহণ করা প্রয়োজন তা গ্রহণ করছে না। শর্করা, প্রোটিন, চর্বিসহ অন্যান্য খাদ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন ভিটামিন ও মিনারেল-সমৃদ্ধ খাদ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে আর সেই ভিটামিন ও মিনারেল-সমৃদ্ধ খাদ্যের প্রধান উত্স হলো উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। সবজি মূলত ভিটামিন ও মিনারেল বা মানুষের শরীরের অতিপ্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট-সমৃদ্ধ খাদ্য সম্ভার। সবজিকে দেহরক্ষাকারী খাদ্য (protective food) হিসেবে সারা পৃথিবীতে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণ সবজি গ্রহণ করলে অপুষ্টিজনিত রোগ যেমন—রাতকানা, এনেমিয়া, গলগণ্ড, স্ক্যাব প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এছাড়া সবজিতে বেশ কিছু ফাইটোকেমিক্যালস পাওয়া যায়, যা শরীরের টিউমার তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করতে ও অন্যান্য রোগপ্রতিরোধ করতে সক্ষম। বর্তমানে বাংলাদেশে দৈনিক মাথাপিছু সবজি গ্রহণের পরিমাণ ১৬৭ গ্রাম (FAO 2017) যা অনুমোদিত মাত্রার (২০০ গ্রাম, FAO; ২২০ গ্রাম HIES) চেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে কম। পুষ্টিবিদগণের পরামর্শ অনুযায়ী দৈনিক মাথাপিছু ৩০০ গ্রাম সবজি (পাতাজাতীয় ১০০ গ্রাম ও অন্যান্য ২০০ গ্রাম) খাওয়া প্রয়োজন (বারডেম, ২০১৪); কিন্তু আমরা খাচ্ছি প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। তাই দেহ শক্তিশালী করার জন্য প্রচুর সবজি খাওয়া দরকার। বাংলাদেশে চাষাধীন জমি শূন্য দশমিক ৪০৫ মিলিয়ন হেক্টর থেকে উত্পাদন হয় ৪ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন টন সবজি, অথচ বর্তমান ১৬৩ দশমিক ০৪ মিলিয়ন জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশে সবজির চাহিদা ১৬ দশমিক ৭০ মিলিয়ন টন (বিবিএস, মে ২০২০)।

প্রকৃতপক্ষে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ও প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টিগুণ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত অর্থাত্ আমরা যে পরিমাণ খাদ্য খাচ্ছি সেটা কতটুকু পুষ্টিসমৃদ্ধ ও নিরাপদ এ বিষয়গুলোকেও দৃষ্টিভঙ্গিতে আনতে হবে। তাই কৃষিমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণের দিকে এগুচ্ছিল তখনই আকস্মিকভাবে মহামারি আকারে গোটা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিল কোভিড-১৯। এই প্রাণঘাতী ভাইরাসকে মোকাবিলা করার জন্য এই মুহূর্তে উচ্চ পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। আর এটা শুধু সম্ভব নিরাপদ উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন সবজির উত্পাদন, সহজলভ্যতা ও গ্রহণের মাধ্যমে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যমতে বাংলাদেশের শতকরা ৭০ ভাগ পুরুষ ও ৭৫ ভাগ মহিলা আয়রন স্বল্পতায় ভুগছে। এছাড়া ভিটামিন-এ-এর ঘাটতি ৮৮ শতাংশ ও ভিটামিন-সি-এর ঘাটতি ৯৯ শতাংশ। পরিবারের মহিলাদের ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ ও ৫ বছরের নিচের শিশুদের জিংকের স্বল্পতা ৮৮ শতাংশ। এভাবে সব ধরনের ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতি চিত্র আছে অথচ এই ঘাটতিগুলো আমাদের দেশে উত্পাদিত সবজি ও ফলমূলসহ বিভিন্ন খাদ্য দ্বারা পূরণ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০-এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো টেকসই কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন। বিগত এক দশকে দেশের প্রায় প্রতিটি সেক্টরে অভাবনীয় সফলতার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। আজ দানাজাতীয় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে একথা সত্য যে, খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে এগিয়ে গেলেও পুষ্টিনিরাপত্তা অর্জনে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। এক্ষেত্রে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন।

 ১. বছরব্যাপী সবজি উত্পাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ ও পঞ্জিকা তৈরিকরণ। ২. বসতবাড়ির প্রতিটি একক অংশকে (ইউনিট) সবজি চাষের আওতায় আনা। এই কর্মসূচির আওতায় কৃষকের বাড়িসংলগ্ন উন্মুক্ত স্থান, ঘরের চাল, ছায়াযুক্ত স্থান আবাদের আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সরেজমিন গবেষণা বিভাগ কর্তৃক সবজি উত্পাদনের বিভিন্ন মডেলকে অনুসরণ করা যেতে পারে। ৩. শস্য পর্যায় অবলম্বনসহ মাঠ ফসলের মধ্যে অধিকতরভাবে সবজি ফসলের জমির পরিমাণ বৃদ্ধিকরণ। ৪. উচ্চ পুষ্টির গুণাগুণসম্পন্ন সবজি নির্বাচন করা ও আবাদের পরিমাণ বৃদ্ধি করা ও সহজলভ্য করার পরিকল্পনা গ্রহণ। ৫. রঙিন সবজির গুণাগুণ সম্পর্কে অবহিতকরণ, উত্পাদন বাড়ানো। ৬. উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনসহ উন্নত উত্পাদনের কলাকৌশল উদ্ভাবনসহ সম্প্রসারণের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ৭. উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনসহ উত্পাদন কলাকৌশল উদ্ভাবন ও বীজসহ উত্পাদনের সব উপকরণ সহজলভ্য করণ। ৮. নিরাপদ সবজি উত্পাদন ও উত্তম কৃষি চর্চার ধাপসমূহ যথাযথভাবে অনুসরণ করা এবং খাদ্যোপযোগীকরণের সব ধাপ অনুসরণ।

কোভিডসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষিক্ষেত্রে টেকসই উত্পাদন অব্যাহত রাখার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। পুষ্টিকর খাবারের স্বল্পতা ও স্বল্প প্রাপ্যতা বিপুল জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে দিচ্ছে। কাজেই করোনা মোকাবিলায় কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উত্তরণের জন্য করণীয় পদক্ষেপ আশু গ্রহণ বিশেষ প্রয়োজন। এছাড়াও উচ্চমূল্যে ফসলের জাত উন্নয়ন উচ্চ পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি চিহ্নিতকরণ, ফসল সংগ্রহ, প্রযুক্তির উদ্ভাবন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

 লেখক :মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং বিভাগীয় প্রধান

সবজি বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র (এইচআরসি), বারি, জয়দেবপুর, গাজীপুর।