সম্প্রতি সাভারের আশুলিয়ায় এক কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক দুই ছাত্রকে হাত-পা বাঁধিয়া বেধড়ক পিটাইয়াছেন, যাহার ভিডিও ভাইরাল হইয়াছে সামাজিক মাধ্যমে। এই ভিডিওর উত্স সেইখানকার সিসিটিভি ক্যামেরা। এই ঘটনায় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অভিযুক্ত শিক্ষককে গণপিটুনি দিয়া পুলিশের হাতে সোপর্দ করিয়াছে। শুধু মাদ্রাসা নহে, পড়াশুনায় উন্নতি সাধন এবং আদবকায়দা, নীতি-নৈতিকতা ও নিয়ম-শৃঙ্খলা শিখানোর নামে কখনও কখনও স্কুল কলেজেও শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের প্রহার বা বেত্রাঘাতের কথা প্রায়শ পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়। ইউনিসেফ পরিচালিত এক জরিপে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের ৯১ শতাংশের মতে, বিদ্যালয়ে শারীরিক শাস্তি প্রদানের ঘটনা ঘটিয়া থাকে।
১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যে শিশু অধিকার সনদ গৃহীত হয়, সেইখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর উপর নির্যাতন স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হইয়াছে। বাংলাদেশে ১৯৯৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর হইতে তাহা কার্যকর হইয়াছে। বিশেষ করিয়া, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১০ সালে দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করিয়া এক পরিপত্র জারি করে। তাহাতে যে শাস্তিগুলির কথা বলা হয় তাহা হইল : হাত-পা বা কোনো কিছু দিয়া আঘাত বা বেত্রাঘাত, শিক্ষার্থীর দিকে চক বা ডাস্টার ছুড়িয়া মারা, কামড় দেওয়া, চুল টানা বা চুল কাটিয়া দেওয়া, হাতের আঙুলের ফাঁকে পেনসিল চাপা দিয়া মোচড় দেওয়া, ঘাড় ধাক্কা দেওয়া, আছাড় দেওয়া, চিমটি কাটা, কান টানা বা কান ধরিয়া উঠবস করানো, চেয়ার-টেবিল বা কোনো কিছুর নিচে মাথা দিয়া দাঁড় করানো বা হাঁটু গাড়িয়া দাঁড় করাইয়া রাখা, রোদে দাঁড় করাইয়া বা শুয়াইয়া রাখা কিংবা সূর্যের দিকে মুখ করিয়া দাঁড় করানো এবং এমন কোনো কাজ করানো, যাহা শ্রম আইনে নিষিদ্ধ। এই জন্য প্রয়োজনে বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০, ১৯৭৪ সালের শিশু আইন ও ক্ষেত্রমতে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে।
মধ্যযুগে শিক্ষা যখন ছিল গুরু-শিষ্যের ব্যাপার, তখন শিক্ষার্থীরা গুরুর সেবার মাধ্যমে লেখাপড়া করিত। ভারতীয় উপমহাদেশে কয়েক যুগ পূর্বেও বেত্রাঘাতের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শাসনের নিয়ম অভিভাবকদের নিকট দোষণীয় তো নহে, বরং কাম্য ছিল। কিন্তু একপর্যায়ে এই শাসন কোথাও কোথাও নির্যাতনে রূপ লইলে প্রশ্ন উঠিতে শুরু করে। আমেরিকায় শিশুদের পড়াশুনার পদ্ধতি এমন যে, শিশুরা খেলাধুলা, প্রাত্যহিক কাজে লাগে—এমন হোমওয়ার্ক ও আনন্দের মাধ্যমে শেখে। পক্ষান্তরে ব্রিটেনে শিশুরা এখনো কড়া শাসনের মাধ্যমে লেখাপড়া করে। আসলে ইহার মধ্যে কোনটি উত্তম তাহা বলা মুশকিল। তবে আমরা মনে করি, মধ্যম পন্থাই উত্তম পন্থা। শিশুদের একেবারে অনুশাসনে না রাখিলে তাহাদের ভবিষ্যত্ জীবন ক্ষতির কারণ হইয়া দাঁড়াইতে পারে। এই জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের ন্যূনতম শাসন অনুপস্থিত থাকিলে তাহার নেতিবাচক দিক যে আছে, তাহাও কিন্তু অস্বীকার করিবার উপায় নাই। মোদ্দা কথা, শাসনকারীর একমাত্র উদ্দেশ্য হইবে শিক্ষার্থীর সংশোধন ও লেখাপড়ায় উন্নতিসাধন। কোনোভাবেই রাগ-ক্ষোভ বা বিরক্তির চিন্তা হইতে শিক্ষকের হাতের বেত বা লাঠি সক্রিয় হইতে পারে না।
