বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণ করাই আমার স্বপ্ন

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৩৪

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম

‘স্বপ্ন সেটা নয়, যেটা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে। স্বপ্ন সেটাই, যেটা পূরণের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না’—ভারতের সাবেক প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম আজাদের বিখ্যাত এই উক্তি আমাকে বরাবরই প্রেরণা দেয়, উত্সাহ দেয়। আমার এই  ক্ষুদ্র জীবনে ঘটছেও তা-ই। স্বপ্ন আমাকে ঘুমাতে দেয় না। মানুষের স্বপ্ন পূরণই এখন আমার স্বপ্ন। আমি স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখাই। গাজীপুর সিটি করপোরশেন এলাকায় বসবাসকারী অর্ধকোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশা আমার অস্থিমজ্জার ভেতর লেগে আছে। গাজীপুর সিটিকে একটি আধুনিক নগর গড়ার যে স্বপ্ন দেখিয়ে ছিলাম আমিই, সেই স্বপ্ন হাঁটি হাঁটি পা পা করে হেঁটে যাচ্ছে গন্তব্যের দিকে। যদিও এই স্বপ্নগুলো কেড়ে নিয়েছে আমার ঘুম। তাতে কোনো আফসোস বা আপত্তি নেই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেখা স্বপ্ন পূরণে অন্তত কাজ করতে পারছি তো! এটাই আমার পরম সৌভাগ্য। এই সুযোগটি আমাকে করে দিয়েছেন তারই কন্যা বাঙালির আশা ও ভরসার একমাত্র ঠিকানা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

 ‘এই বাংলার আকাশ বাতাস, সাগর গিরি ও নদী/ ডাকিছে তোমারে বঙ্গবন্ধু ফিরিয়া আসিতে যদি’—কবি সুফিয়া কামালের মতো এভাবে আমিও মাঝে মাঝে ভাবি। বঙ্গবন্ধু যদি আবার ফিরে আসতেন। অন্ত্মত একবার এসে যদি পিতা দেখে যেতেন তারই হাতে গড়া বঙ্গভূমি কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। কীভাবে এগিয়ে নিচ্ছেন তার কন্যা শেখ হাসিনা। পৃথিবীর বুকে আজ কীভাবে দাঁড়িয়েছে মাথা উঁচু করে। আমার বিশ্বাস, জাতির পিতা টুঙ্গিপাড়ায় শুয়ে নিশ্চয় দেখছেন তার কন্যার হাত ধরে দেশ এগিয়ে যাওয়ার এমন দৃশ্য। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন। বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও স্বাধীনতা—এই শব্দত্রয় একই সূত্রে গাঁথা। আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং উন্নয়নের রূপকার ও নির্মাতা ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সদ্যস্বাধীন দেশে রাতদিন এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ছুটে গেছেন তিনি কীভাবে যুদ্ধবিধ্বসত্ম দেশের পুনর্গঠন ও নির্মাণ করা যায়—এমন ভাবনা থেকেই। সফলতার দেখাও হয়তো পেতেন তিনি পর্যাপ্ত সময় পেলে। কিন্তু সে সুযোগ পাননি তিনি। সুযোগ দেয়নি একদল বিশ্বাসঘাতক। পিতা মুজিবকে সপরিবারে তারা হত্যা করেছে কিন্তু তার আদর্শকে হত্যা করতে পারিনি। তার আদর্শকে হত্যা করা যায় না। সুতরাং জাতির পিতাকেও হত্যা করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পাঠ করে তার ৫৫ বছরের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়—তার জীবনের প্রতিটা অধ্যায় কতটা সততার মধ্যে ছিল। শুধু তাই নয় নিষ্ঠা, ত্যাগ, শ্রম ও মেধার স্বাক্ষর রেখেই এগিয়েছেন সামনে।

জাতির পিতার আদর্শ সততা আর নিষ্ঠা বুকে ধারণ করে একদিন শুরু করেছিলাম রাজনীতি, সেই ছোট্টবেলায়। স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি তখনও। সময় অনেক গড়িয়ে গেছে। থামিনি। মানুষের সেবা করার ব্রত আমার আজন্মের। সেটা আরো বেড়ে যায় যখন বঙ্গবন্ধুর কন্যা বিশ্বমানবতার অগ্রদূত আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ পাই। তবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যখনই যাই, তখনই দেখি তিনি কাজে ব্যস্ত। এই বয়সেও তিনি যে এতো কাজ করেন তা দেখে আমি অনুপ্রাণিত হই। তাই আমার মাতৃতুল্য শেখ হাসিনার নির্দেশ এবং তারই মহানুভবতায় এখন গাজীপুর নগরবাসীর ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করছি। কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বেশ দূরে অবস্থান করা গাজীপুর নগরবাসীর আশা আকাঙ্খা পূরণ করাই আমার ব্রত।  তবে দীর্ঘদিন জমিয়ে রাখা এতগুলো কাজ একসঙ্গে করা সম্ভব নয়। আস্তে আস্তে উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটছে প্রিয় গাজীপুর সিটি। মেয়র হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে ইতিমধ্যে। চলাচলের অনুপযোগী প্রায় ৭০০ কিলোমিটার রাস্তা এরই মধ্যে মেরামত করেছি।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সময়ের প্রয়োজনে ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের যাত্রা শুরু হয়। শিল্প অধ্যুষিত প্রায় ৩৩০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের গাজীপুর সিটিকে ভাগ করা হয় ৫৭টি ওয়ার্ডে। ২০১৮ সালে সিটি করোপোরেশন নির্বাচনে আমার হাতে নৌকা প্রতীক তুলে দেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিএনপি মনোনীত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে প্রায় দুই লাখ ভোট বেশি পেয়ে ৩৮ বছর বয়সে আমি মেয়র নির্বাচিত হই। প্রধানমন্ত্রী আমাকে নগরবাসীর সেবা করার সুযোগ দেন। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সব নেতাকর্মী ঐক্যবদ্ধ হয়ে নৌকার বিজয় অর্জনে মাঠে কাজ করেন। এ নির্বাচনে জয়ী হয়ে পুরো মহানগরকে সাজানোর কাজে হাত দিই। যদিও সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর প্রথম নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটসমর্থিত প্রার্থী বিজীয় হয়েছিলেন। ফলে রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী গাজীপুর নগরবাসী কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হন।

চলতি বছরে ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছি। দেশরত্ম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহানুভবতায় ইতিমধ্যে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে গাজীপুর সিটি। পুরোদমে এগিয়ে চলছে উন্নয়নমূলক নানা কর্মকাণ্ড। গাজীপুর মহানগরের চেহারা এখন পালটে গেছে। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের অভাব-অভিযোগ মোচন হওয়ার পথে। যেসব রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, মসজিদ-মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুতের কাজ চলছে, তা বাস্তবায়ন হতে খুব বেশি দিন লাগবে না। কাজগুলো শেষ হলে নগরবাসীর সমস্ত ভোগান্তি দূর হবে। প্রশান্তি পাবে। ইতিমধ্যে আমরা একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করেছি। সে অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। বিভিন্ন বাসাবাড়ি. কলকারখানা ও দোকানপাট থেকে ৩ হাজার টন বর্জ্য বের হয়। সেই বর্জ্যগুলো দিয়ে বিদ্যুত্ তৈরির পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। নগরবাসীকে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহের জন্য বৃহত্ একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা তা বাস্তবায়ন হবে। মহানগরের আটটি থানা এলাকায় একটি করে আধুনিক স্কুল প্রতিষ্ঠা, প্রত্যেক ওয়ার্ডে একটি করে কবরস্থান ও পার্ক তৈরি, আধুনিক মানের হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। ভাসমান মানুষের জন্য গৃহনির্মাণ, ফুটপাত দখল করে যারা ব্যবসা করছেন তাদের জন্য দোকান বরাদ্দ দেওয়ার কাজ চলছে। মহানগরের বসবাসকারী সব মুক্তিযোদ্ধার ট্যাক্স মওকুফ ছাড়াও তাদের সন্তানদের চাকরির সুবিধা রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের নামে রাস্তা ও প্রতিষ্ঠান করা হচ্ছে।

জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই দলকে সুসংগঠিত করতে কাজ করছি। দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে কমিটি গঠন ছাড়াও বিতর্কিতদেরকে বাদ দিয়েছি। এতে নতুন ও ত্যাগী নেতাকর্মীরা নেতৃত্বে এসেছে। ফলে দল আরো চাঙ্গা হয়েছে। স্বপ্নবাজ সেই সব তরুণ নেতৃত্ব দলকে কোনোভাবেই সমালোচনা কিংবা বিতর্কিত করবে না বলে অঙ্গীকারাবদ্ধ।

নগরবাসীর জন্য কাজ করছি। রাত দিন কাজ করছি। সেই কাজে দৃষ্টি কেড়েছে অনেকেরই। তৃতীয় নয়নের মানুষ হিসেবে পরিচিত দেশ বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের অমর স্রষ্ঠা আবদুল গাফফার চৌধুরীও পর্যবেক্ষণ করেছেন আমার কাজ। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া দায়িত্ব কতটা পালন করছি, সে দিকে তার নজরও রয়েছে। এ নিয়ে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লন্ডন থেকে গত ৬ সেপ্টেম্বর ইত্তেফাকে তার পাঠকপ্রিয় কলাম দশদিগন্তে বিস্তারিত লিখেছেন। ‘শেখ হাসিনা রোপিত গাছে ফল ধরতে শুরু করেছে’ শিরোনামে লেখা ওই কলামে শ্রদ্ধেয় গাফ্ফার চৌধুরীর বিশ্লেষণকে আমি শ্রদ্ধা জানাই এবং তিনি অকপটে চরম সত্যটা বলেছেন। শ্রদ্ধেয় গাফ্ফার চৌধুরীর এই সত্যকথন আমার জন্য উত্সাহ-প্রেরণা হয়ে থাকবে। তার বিশ্লেষণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। সত্ থেকে আজীবন মানুষের সেবা করে যাওয়ার সিদ্ধান্তে আমি অবিচল। জনাব চৌধুরীর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ভালোবাসা। কৃতজ্ঞতাও। কাজ করতে চাই মানুষের জন্য, দেশের জন্য।

n লেখক :মেয়র, গাজীপুর সিটি করপোরেশন