রুকাইয়া আক্তার
আসলেই আমাদের সমাজে কৃষকেরা এখনও অবহেলা আর অবমাননার শিকার। তারা তাদের যথাযথ মূল্যায়ন না পায় দেশ থেকে, না পায় দেশের জনগণ থেকে। বর্তমানে এই করোনার সময়ে সারা বিশ্বে স্থবির, অচল ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই অমানিশার অন্ধকারে মানুষ কর্মহীন হয়ে ঘরের চারদেওয়ালের মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ে আছে, যেখানে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার উপায় নেই। সমাজের নিম্নবিত্তসহ মধ্যবিত্তরা পড়েছে চরম বিপাকে। তারা আর্থিক সংকটে পড়ে বেছে নিয়েছে অসচ্ছল জীবনযাপন। শ্রমিকদের ছাঁটাই করে দেওয়া হয়েছে তাদের কর্মস্থল থেকে। প্রায় ৭৫ শতাংশ শ্রমজীবী শিল্পকারখানার সঙ্গে জড়িত। বিজিএমআইএর তালিকাভুক্ত প্রায় ৪ হাজার কারখানায় ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করেন। এই করোনার জন্য প্রায় ১৫টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন রপ্তানি আয়ের বেশির ভাগই জোগান দেয় পোশাকশিল্প, যা এই করোনায় ধসে পড়েছে। কারণ বাংলাদেশে এই শিল্প টিকে আছে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সেই সব দেশে করোনা ভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের কারণে বহু পশ্চিমা ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে তাদের অর্ডার বাতিল কিংবা স্থগিত করেছে। একটা দেশের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য শুধু একটা বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা উচিত নয়। সবগুলোকে তার অবস্থান অনুযায়ী প্রাধান্য দিতে হবে, যাতে যে কোনো পরিস্থিতি সহজেই মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। আমাদের দেশে কৃষিকাজকে চরম অবমাননা করা হয় এবং কৃষকেরা তাদের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ায় কৃষিকাজের ব্যাপারে অনুত্সাহিত হয়ে পড়েছেন। তবে এখন যারা কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত, তারা কৃষিতে কিছুটা আগ্রহ দেখালেও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের বেশির ভাগই এ কাজে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করে না। অথচ এই কৃষিকাজের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের দেশ গড়ে উঠেছে। কয়েক দশক আগেও আমাদের দেশের অধিকাংশ কবিতা, গান, গল্প ও উপন্যাস কৃষি ও কৃষকদের নিয়েই রচিত হতো। এ দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে কৃষি ও কৃষক সম্প্রদায়। এখন আমরা কৃষিকে শুধু স্লোগানের জন্যই বরাদ্দ রাখি যে ‘কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ’। কিন্তু বাস্তবে এর কার্যকারিতা ও প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয় না।
কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ৭০ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বর্তমানে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। একসময় রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসত পাট, চা, চামড়া থেকে। আর এখন রপ্তানি আয়ের বেশির ভাগই জোগান দেয় পোশাকশিল্প। অন্যদিকে কৃষকেরা যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ায় নিরুত্সাহিত হয়ে কৃষি খাত থেকে সরে আসছেন। কৃষকদের ঠকিয়ে মধ্যস্থতাকারীরা বেশি সুবিধা ভোগ করছে। বাজারে তাদের উত্পাদিত ফসলের ব্যয়ের তুলনায় কম মূল্য প্রদান করা হয়। একটি দেশে বাজেটের তালিকায় প্রথম তিন শ্রেণিতে কৃষি খাতের থাকার কথা, সেখানে আমাদের দেশে সর্বনিম্ন পর্যায়ের তৃতীয় শ্রেণিতে কৃষি খাতের অবস্থান। যদিও এ বছর কৃষি খাতে বাজেট বেশি করেছে, তবে আরেকটু বেশি প্রত্যাশা ছিল। করোনায় প্রমাণিত হয়েছে, কৃষিই বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে মজবুত ভিত। আর বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় যদি কৃষিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, তাহলে কৃষি তার জোগান প্রাক্কলিত হারেই দিয়ে যায়। বহুল জনসংখ্যার এই দেশকে খাদ্যদ্রব্য সরবরাহে তেমন কোনো অসুবিধায় পড়তে হয় না। শুনতে হয় না, ‘আজ কোনো রকমে খেতে পারব, কাল হয়তো না খেয়ে থাকতে হবে।’ সর্বোপরি, কৃষি ও কৃষকই আমাদের দেশ। সুতরাং বিভিন্ন প্রণোদনা ও বাজেটের মাধ্যমে তাদের প্রাধান্য দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
