অজিত মনি দাস
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চিরহরিত্ বন উচ্চারণ করলেই আমাজনের কথা সামনে আসে। পৃথিবীর ফুসফুস হিসেবে খ্যাত আমাজন জঙ্গল অক্সিজেনের বিশাল উত্স হিসেবে কাজ করে, যা বিশ্বের মোট অক্সিজেনের ২০ শতাংশ। কিন্তু পৃথিবীর ফুসফুসে এখন ক্ষতের চিহ্ন। তবে এ ক্ষত আজকের নয়, অনেক আগে থেকেই। বর্তমানে তা প্রকট আকার ধারণ করতে চলেছে। বন উজাড়, আগুন লাগা, মানবসৃষ্ট নানান কর্মকাণ্ড যেন ক্ষতের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে দিচ্ছে আর অসত্ ব্যক্তিদের কুদৃষ্টি তো পৃথিবীর ফুসফুসের দিকে আছেই। ৯টি দেশ জুড়ে আমাজন বন বিস্তৃত থাকলেও, এটি একটি আন্তর্জাতিক সংকট। প্রায় ৩০ লাখ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর বসবাস এই ফুসফুসখ্যাত আমাজনে। বৃক্ষ রয়েছে প্রায় ৩৯০ বিলিয়ন। কিন্তু দাবানলের কড়াল গ্রাসে বিলুপ্ত হতে চলেছে এখনো নাম না জানা বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী। আমাজনের মাত্র কিছু অংশই গবেষণার আওতায় আনতে পেরেছে আন্তর্জাতিক গবেষক দল।
উদ্ভিদের গুণের শেষ নেই, এর মধ্যে ভেষজ গুণ কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয় মহামারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক। কিন্তু বর্তমানে এখনো কিছু রোগের সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব হয়নি এবং কয়েকটি রোগের ওষুধ আবিষ্কারেও সফলতার মুখ দেখতে পাননি বিজ্ঞানীরা। কিন্তু কে বলতে পারে, বহু ব্যর্থতার সাফল্য বয়ে আনতে পারে আমাজনের অজানা কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী! নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে আমাজনের বৈচিত্র্য, বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে গবেষণার ছোঁয়া না পাওয়া অধিকাংশ উদ্ভিদ ও প্রাণী, যা আমাদের ভবিষ্যত্ পৃথিবীর জন্য দুঃসংবাদ। আমাজনের ধ্বংসলীলায় মানবজাতির টিকে থাকা নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়াটাও কি স্বাভাবিক নয়? ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার অববাহিকা পরিবেষ্টিত আমাজনের প্রায় ৫৫ লাখ কিলোমিটার আর্দ্র জলবায়ু দ্বারা প্রভাবিত। সরকারি হিসাবেই আমাজনে ব্রাজিলের অংশেই আগুনের ঘটনা ঘটেছে ৭২ হাজারেরও বেশি, যা আগের বছরের তুলনায় ২০১৯ সালে বেড়েছে দ্বিগুণ। এজন্য বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ সন্দেহের আঙুল দেখাচ্ছে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেয়ার বলসোনারোর দিকেই। কিন্তু বলসোনারো সন্দেহের আঙুল ঘুরিয়ে দিচ্ছেন বেসরকারি সংস্থাগুলোর ওপরে। ব্রাজিলের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইএনপিই) গবেষক, প্রফেসর লুসিয়ানা গাট্রির নেতৃত্বে বিজ্ঞানীদের একটি দল গ্রিনহাউজ গ্যাস পরিমাপ করছে গত ১০ বছর ধরে। গাট্রির গবেষণায় দেখা যায়, আমাজন রেইন ফরেস্টের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল মোট এলাকার প্রায় ২০ শতাংশ কার্বন উেস পরিণত হয়েছে।
সর্বশেষ একটি গবেষণায় দেখা যায়, আমাজনের এক-পঞ্চমাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের চেয়ে বেশি নির্গত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৩০ বছরের মধ্যেই আমাজন রেইন ফরেস্টের অর্ধেকেরও বেশি ক্রান্তীয় বৃষ্টিপাত থেকে সাভানায় পরিবর্তিত হতে পারে, যেখানে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০-এর দশকে আমাজন শক্তিশালী কার্বন সিঙ্ক ছিল এবং প্রতি বছর বায়ুমণ্ডল থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করতে পারত। তাহলে বুঝতে বাকি থাকে না যে পৃথিবীর জন্য কী অপেক্ষা করছে অদূর ভবিষ্যতে। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব কমিয়ে আনতে আমাজনকে টিকিয়ে রাখার বিকল্প কিছু নেই। আমাজন বনের একটি অঞ্চল বিনষ্ট মানে পৃথিবীর আয়ু এক দশক কমিয়ে আনা, মানবজাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলা। আন্তর্জাতিক মহল যে বিষয়টিতে নজর দিয়েছে, তা আরো গুরুত্বসহকারে দেখা, আমাজনে বন উজাড়, আগুন লাগতে পারে এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আমাজনে গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত করা এবং প্রসারিত করা ভবিষ্যত্ পৃথিবীর জন্য।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
