কক্সবাজার পুলিশের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা, নিচ্ছে না ঘুষ টাকা ফিরিয়েও দিচ্ছে অনেকে

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:৩৬

কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের চেকপোস্টে গত ৩১ জুলাই মেজর (অব.) সিনহা হত্যার পর গতকাল বুধবার পর্যন্ত পাঁচ থানার ওসিসহ কক্সবাজার জেলার শতাধিক পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রায় দেড় ডজন মামলা দায়ের করেছে ভুক্তভোগীরা। বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা, মিথ্যা মামলা, চাঁদাবাজিসহ নানান ধরনের হয়রানির অভিযোগ আসছে এসব মামলায়। এভাবে একের পর এক মামলায় জেলা পুলিশের অনেক সদস্যের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আগে লোকজনকে মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে আদায় করা ঘুষের টাকা ফিরিয়ে দিচ্ছে অনেক পুলিশ সদস্য। এখন মামলা বা অন্য আইনি সহায়তার জন্য স্বেচ্ছায় কেউ ঘুষ দিতে চাইলেও তারা নিচ্ছে না। কেউ কেউ অতীতে নেওয়া ঘুষের টাকা ফিরিয়ে দিতে না পারলেও নিজের অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাচ্ছে ভুক্তভোগীদের কাছে। মামলা থেকে রেহাই পেতে, সর্বোপরি নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কক্সবাজার জেলা পুলিশ। জানা গেছে, প্রতিপক্ষের হয়রানির শিকার ব্যক্তিরা এখন মামলা করতে থানায় গেলে সহজে সেটি রেকর্ড করছে পুলিশ। আগে এসব অভিযোগে মামলা রেকর্ড করতে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হলেও এখন কোনো টাকা চাওয়া হচ্ছে না। এমনকি স্বেচ্ছায় ঘুষ দিতে চাইলেও পুলিশ তা ফিরিয়ে দিচ্ছে।

টেকনাফের বাসিন্দা টমটমচালক আবুল কালাম জানান, গত ১৮ জুলাই ইয়াবা দিয়ে চালান করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে একপ্রকার জিম্মি করে ৩৫ হাজার টাকা আদায় করে টেকনাফ থানার সাগর নামে এক কনস্টেবল। সে সময় স্থানীয় এক দালালও তার সঙ্গে ছিল। সিনহা হত্যার পর পুলিশের বিরুদ্ধে যখন একের পর এক মামলা হচ্ছে তখন আমিও পুলিশ সদস্য সাগরের বিরুদ্ধে মামলা করব বলে জানাই। এরপর সাগর এবং ঐ দালাল মামলা না করার অনুরোধ জানিয়ে ১৫ হাজার টাকা ফিরিয়ে দেন।

রহমত উল্লাহ নামে আরেকজন জানান, টেকনাফ থানার বহিষ্কৃৃত ওসি প্রদীপের ছত্রছায়ায় থাকা পুলিশ সদস্যরা অতীতে যথেচ্ছ চাঁদাবাজি করেছেন। এখন মামলা ও পত্রিকায় ছবিসহ সংবাদ                 প্রকাশ হবার ভয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আদায়কৃত টাকা ফিরিয়ে দিচ্ছে। কক্সবাজার সদরের বাসিন্দা আমেনা বেগম  জানান, প্রতিবেশীর হাতে প্রায়ই নির্যাতনের শিকার হয়ে বেশ কয়েকবার সদর থানায় গেলেও টাকা না থাকায় অভিযোগ গ্রহণ করা হয়নি। সম্প্রতি আবারও নির্যাতিত হয়ে থানায় গেলে টাকা ছাড়াই অভিযোগ গ্রহণের পর ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। টেকনাফসহ জেলার আট উপজেলায় পুলিশের বদান্যতার এমন আরো অনেক তথ্য এসেছে। কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, মাদক নির্মূলের নামে ‘বন্দুকযুদ্ধ নাটকে’ হত্যাকাণ্ড আমাদের বিস্মিত করেছে। বর্বরোচিত এসব ঘটনায় পুলিশের প্রতি মানুষ এখন আস্থাহীন। এখন পুলিশ বাহিনীকে স্ব-উদ্যোগে সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানোর দায়িত্ব নিতে হবে।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম বলেন, ঘুষ বাণিজ্যসহ সবধরনের অপরাধমূলক কাজ থেকে পুলিশকে বিরত রাখতে হলে উন্নত নীতিনৈতিকতার প্রশিক্ষণের ওপর আরো জোর দিতে হবে। পাশাপাশি বাহিনীর সুনাম ধরে রাখতে যে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা আমলে নিয়ে তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পুলিশ কর্তৃক হয়রানির শিকার হলে সাধারণ মানুষ যেন নির্ভয়ে অভিযোগ করতে পারেন সেই পরিবেশ পুলিশ বাহিনীকেই তৈরি করতে হবে।

কক্সবাজার সদর থানার ওসি মাসুম খান জানান, অপরাধ কর্ম বা ঘুষ বাণিজ্যে পুলিশের কেউ জড়াচ্ছে কিনা সে বিষয়ে নজর রাখা হচ্ছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন  বলেন, পুলিশের অর্জিত সুনাম ধরে রাখতে যা করণীয় সবই করা হচ্ছে। পুলিশ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কেউ পুলিশ কর্তৃক হয়রানির শিকার হলে ভুক্তভোগীকে নির্ভয়ে অভিযোগ করার আহ্বান জানিয়ে ডিআইজি বলেন, অভিযোগ তদন্তপূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।