কথায় আছে—ময়ূরের পুচ্ছ পরিধান করিলেও কাক কখনো ময়ূর হইবে না, কোনো না কোনোভাবে কাকের ভেক ধরা পড়িবেই। কিন্তু প্রশ্ন হইল, কাক কেন ময়ূর হইতে চাহে? নিশ্চয়ই ময়ূরের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা রহিয়াছে। একইভাবে যখন যেইখানে বিশেষ সুযোগের সংস্থান থাকিবে, সেইখানে কাকের দল ভিড় করিবেই। এমনটি দেখা যায় জগতের সর্বত্রই। মুক্তিযোদ্ধার নামের তালিকাতেও আমরা কাকের ছড়াছড়ি দেখিতে পাইতেছি। বৃহস্পতিবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাইতে পারে। খবরে বলা হইয়াছে—যুদ্ধকালে বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতির সহিত জড়িত থাকিবার অভিযোগ উঠিলেও মোংলার বুড়িরডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা মো. দেলোয়ার হোসেন কিনা এখন ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা! স্থানীয় প্রশাসনের তদন্তে ডাকাতির সহিত নাকি দেলোয়ারের জড়িত থাকিবার সত্যতাও মিলিয়াছে। নিজে কেবল ভাতা লইয়া ক্ষান্ত দেন নাই, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় এক সন্তানকে পুলিশে চাকুরিরও ব্যবস্থা করিয়াছেন।
মুক্তিযোদ্ধারা এই দেশের ক্ষণজন্মা মানব। পরিতাপের বিষয় হইল—স্বাধীনতার প্রায় সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে আসিয়াও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান তথা মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ কোনো তালিকা এখনো অবধি তৈরি করা সম্ভব হয় নাই। স্বাধীনতার পর অন্তত পাঁচ বার তালিকা হইয়াছে—পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংযোজন-বিয়োজন হইয়াছে। কেহ যেন জানে না, আর কতবার তালিকা তৈরি হইবে? আমরা দেখিয়াছি, অতীতে প্রতিটি সরকার আসিয়া তালিকার সংশোধনের নামে নূতন বিতর্ক সৃষ্টি করিয়াছে। ইহার ফলে যতবারই নূতন তালিকা হইয়াছে, ততবারই ঐ তালিকা লইয়া উচ্চ আদালতে রিট হইয়াছে। ১৯৭২ সালে একটি অর্ডারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু নিজেই মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞায়ন করিয়া গিয়াছেন। ১৯৭২ সালের আদেশে বলা হইয়াছে মুক্তিযোদ্ধা মানে এমন একজন ব্যক্তি, যিনি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত যে কোনো সংগঠিত দলের (ফোর্স) সদস্য হিসাবে সক্রিয় ভূমিকা রাখিয়াছেন। অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি মনে করেন, যদি সহযোদ্ধারা সাক্ষ্য দেন এবং বলেন অমুকে ট্রেনিং লইয়াছেন এবং যুদ্ধ করিয়াছেন, তাহা হইলে ঐ ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে শনাক্ত করা কঠিন নহে। কারণ, মুক্তিযুদ্ধ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নহে। কেহ একা-একাও যুদ্ধ করেন নাই। সুতরাং এখন যেই সকল রাজাকার, আলবদর, আলশামস মুক্তিযোদ্ধার খাতায় নানান কৌশলে নাম ঢুকাইতেছেন, তাহারা নিজ নিজ এলাকায় খুব ভালোভাবেই স্বাধীনতাবিরোধী হিসাবে চিহ্নিত। এলাকার সকলেই জানেন, তাহারা অনুপ্রবেশকারী, কাউয়া।
মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অনুপ্রবেশের মতো আওয়ামী লীগেও স্বাধীনতাবিরোধীদের অনুপ্রবেশের স্রোত বহিয়া যাইতেছে। দুঃখের সহিত বলিতে হয়, বাংলাদেশের অনেক জেলা-উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও দেখা যাইতেছে ব্যক্তিপছন্দ, আর্থিক ও বিভিন্ন স্বার্থের মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত, অগ্রহণযোগ্য ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নিকট বিক্রয় হইতেছে দলের পদ-পদবি। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ অর্জনও একই প্রক্রিয়ায় হইতেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধায় ভাগ বসানো এবং সরকারি দলে ঢুকিয়া বিবিধ অনিয়ম ও সুযোগ-সুবিধা আদায় করাই ইহাদের মূল লক্ষ্য। বলিলে অত্যুক্তি হইবে না যে, ইহা দলকে এক ধরনের ‘বিক্রয়’ করা ছাড়া আর কিছুই নহে। মনে রাখিতে হইবে, একটি দল ক্ষমতায় থাকিতে অপাঙেক্তয় ব্যক্তিদের দ্বারা যতটা দূষিত হয়, দল ততই দুর্বল হইতে থাকে। ইহা ঘুণপোকার মতো, একটি শক্ত ভিতের দলকেও ভিতরে ভিতরে ক্ষয় করিয়া দেয়। সুতরাং সময় থাকিতে সাবধান হওয়া জরুরি।
