অর্থনীতি কি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে?

ধনী দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা নিয়েও ভাবতে হবে

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:০৯

বিশ্ব জুড়ে করোনা, মন্দা এবং লকডাউনে বিপর্যস্ত অর্থনীতি কি সত্যিই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে? ব্যাপক হারে চাকরিচ্যুতি আর আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের গতি বন্ধ হওয়ার পর এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে চলেছে। বিশ্বের প্রায় সবগুলো দেশই লকডাউন উঠিয়ে দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চাঙ্গা করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর। রপ্তানি আদেশও বেড়েছে এমন তথ্য আসছে। যদিও কোনো কোনো কারখানার মালিক বলেছেন, তথ্যের সঙ্গে বাস্তবে কিছুটা ফারাক আছে। তা সত্ত্বেও অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসছে এমনটি নিঃসন্দেহে বলা যায়। কর্মহীন হয়ে পড়া স্বকর্মসংস্থান তথা অসংগঠিত খাতের কর্মীরা বাঁচার তাগিদে কাজে নেমে গেছেন। বলা যায়, সামাজিক দূরত্ব মানার কথা বলা হলেও বাংলাদেশে সবকিছুই এখন পূর্ববর্তী সময়ের মতোই চলছে। করোনার থাবা কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি।

করোনাকালীন সময়েই যে বিতর্কটা উঠেছিল—জীবন না জীবিকা। তারই ধারাবাহিকতায় এখন জীবিকাই প্রাধান্য পাচ্ছে। জীবিকার লড়াইয়ে শরিক হওয়া লোকগুলো তৈরি হয়ে গেছে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের কাজে। যদিও অন্য দেশের মতো বাংলাদেশের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির শঙ্কা কেটে গেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলেছে, বছর শেষে অর্থনীতি এগিয়ে যাওয়ার হার হবে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, বাংলাদেশ দ্রুতই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তিনি আশাবাদী যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের বেশি হবে। হয়তো বছর শেষে এরকম তথ্যই প্রকাশ পাবে। কিন্তু ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোও মোকাবিলা করা জরুরি। অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের বাইরে বাহ্যিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন রপ্তানি, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স এবং কৃষির ওপর দাঁড়িয়ে। এ দুঃসময়ে প্রবাসীরা কর্মহীন হলেও রেমিট্যান্স এসেছে প্রচুর। যে কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর কারণ, প্রবাসীদের ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। তথ্য মতে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে কম এলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স আয় বেড়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের একক শীর্ষ দেশ যুক্তরাষ্ট্র। সেদেশের অর্থনীতি এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায়। ইউরোপ জুড়ে মন্দার অভিঘাত রয়েছে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশই মন্দাক্রান্ত। এসব দেশ বাংলাদেশি পণ্যের অন্যতম বাজার। এ বাজারের ছন্দপতন ঘটেছে। যু্ক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের ক্রেতারা এখন ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। ফলে আমদানি আদেশপ্রাপ্তি এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় আসছে না। একথা ঠিক যে, মাস্ক, পিপিইসহ করোনাকালীন জীবনযাত্রার কিছু পণ্যের আমদানি আদেশ পাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু প্রথাগত রপ্তানি পণ্যের চাহিদা না বাড়লে বছর শেষে আয়ে ধাক্কা আসবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের অর্থনীতি যত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে—ততই বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা বেশি হারে ঘুরবে। যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনীতির গতি ফেরাতে সহায়তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ফেডারেল রিজার্ভ। সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি রাখার সময় আরো দীর্ঘায়িত করার কথা জানিয়েছে ফেড চেয়ারম্যান জেরোমি পাওয়েল। সিএনএনের সংবাদ অনুযায়ী ফেড পরিচালিত জরিপে আগামী ২০২৩ পর্যন্ত সুদের হার শূন্য রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফেড চেয়ারম্যান জেরোমি পাওয়েল বলেছেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া এগিয়েছে। বেকার ভাতার আবেদন আগের চেয়ে কমেছে। সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনায় কর্মসংস্থানে সুফল পাওয়া  গেছে। তবে বিশাল অর্থ ব্যয়ের পরেও মূল্যস্ফীতিতে বড় প্রভাব পড়েনি। গত এক বছর ধরে মূল্যস্ফীতির পরিমাণ ১ দশমিক ৩ শতাংশে বেঁধে রাখা গেছে। অর্থনীতির গতি ফেরাতে ফেডের পক্ষ থেকে সহায়তা বৃদ্ধির আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

মার্কিন শ্রম বিভাগ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত সপ্তাহে ৮ লাখ ৬০ হাজার মানুষ বেকার ভাতার জন্য আবেদন জমা দিয়েছেন। বেকার ভাতার জন্য আবেদন আগের সময়ের চেয়ে কমেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান বাড়ছে, তবে ধীর গতিতে। পরপর দুই সপ্তাহ বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেছে এমন মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ২৬ লাখ।

তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার এগুচ্ছে। বাংলাদেশের রপ্তানিও সেদেশে গতি পাচ্ছে। কিন্তু চীন ও ভারতের অর্থনীতিও এখানে উল্লেখযোগ্য। এ দুটি দেশে ঘুরে দাঁড়ানোর হাওয়া না লাগলেও দুটি দেশের অর্থনীতির সঙ্গেও বাংলাদেশের সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, উন্নত দেশগুলোর দেওয়া অর্থসহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টিও জরুরি। বিশ্ব জুড়ে ধনী দেশগুলো যে পরিমাণ অর্থসহায়তা দিত, সেখান থেকে কিছুটা পিছটান দেওয়া শুরু করেছে। যা গরিব দেশগুলোর জন্য ইতিবাচক হবে না। এক্ষেত্রে কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে বাংলাদেশকে যথাযথ অর্থসহায়তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ কথা ঠিক যে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ভোগব্যয়কেন্দ্রিক। অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় বেশি হওয়ায় এ মুহূর্তে মানুষের হাতে টাকার সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। করোনা মোকাবিলায় ১ লাখ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়নি। যদিও অক্টোবরের মধ্যে এ প্যাকেজের অর্থ ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই লক্ষ্য হয়তো পরিসংখ্যানগতভাবে বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত কম গুরুত্বই পাচ্ছে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা পর্যায়ে এ সুবিধা দিলেও ‘বায়িং ক্যাপাসিটি’ বা ক্রেতাদের পণ্য কেনার সক্ষমতার বিষয়টি উপেক্ষিত রয়ে গেছে। উত্পাদক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভোগব্যয় বাড়লে প্রত্যাশিত হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন দুরূহ হবে না।