এ বছরের গোড়ার দিকে ড. কামাল হোসেনের গণফোরামে সৃষ্ট অচলাবস্থা শেষ পর্যন্ত ভাঙনে রূপ নিতে যাচ্ছে। পালটাপালটি বহিষ্কারের জেরে ৪ মার্চ দলের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করেও সংকট কাটানো সম্ভব হয়নি। বরং দিনে দিনে সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে।
অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, মোস্তফা মহসিন মন্টুসহ সংক্ষুব্ধ কয়েক জন জ্যেষ্ঠ নেতা ২৬ সেপ্টেম্বর সারা দেশের নেতাদের বিশেষ বৈঠক ডেকেছেন ঢাকায়। তবে গণফোরামের বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়ার সোজাসাপ্টা মন্তব্য, ‘কামাল হোসেন ও আমাকে বাদ দিয়ে কোনো বৈঠক ডাকার অধিকার তাদের নেই। এটা খুব অন্যায়। এটা স্যারের (ড. কামালের) ইচ্ছার বিরুদ্ধে।’
পালটাপালটি বহিষ্কারের ঘটনায় গণফোরামে সৃষ্ট ‘অচলাবস্থা’ কাটাতে ৪ মার্চ দলের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন দলটির সভাপতি ড. কামাল হোসেন। এক সপ্তাহ পর দলটির ৭২ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। আহ্বায়ক কমিটি বলা হলেও কমিটির সভাপতি হিসেবে ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ড. রেজা কিবরিয়ার নাম ঘোষণা করা হয় তখন। তবে রেজা কিবরিয়া স্বাক্ষরিত ঐ কমিটিতে জায়গা হয়নি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, মোস্তফা মহসিন মন্টু, অধ্যাপক আবু সাইয়িদসহ অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার। হঠাত্ কমিটি থেকে বাদ পড়া জ্যেষ্ঠ নেতারা তখন থেকেই সংক্ষুব্ধ। ফলে ‘অচলাবস্থা’ নিরসনের বদলে দলটিতে অভ্যন্তরীণ সংকট আরো গতি লাভ করতে থাকে।
সংকট নিরসনে গত ২৩ আগস্ট ড. কামালের সঙ্গে তার বেইলি রোডের বাসায় বৈঠকে বসেছিলেন সুব্রত চৌধুরী, মোস্তফা মহসিন মন্টু ও অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। সেদিনের বৈঠকে আলোচনা ইতিবাচক না হওয়ায় ২৯ আগস্ট আবারও বৈঠক হবে বলে তাদের জানান ড. কামাল। তবে পরে সেই বৈঠক আর হয়নি। ড. কামালের সঙ্গে তাদের আর যোগাযোগও হয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় ২৬ সেপ্টেম্বর বৈঠক ডেকেছেন দলের এই জ্যেষ্ঠ নেতারা।
অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী সোমবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘ফয়সালা করতেই আমরা ২৩ আগস্ট বৈঠকে বসেছিলাম। তবে ফয়সালা হয়নি। এ পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে আমরা সারা দেশের নেতাদের ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ডেকেছি। দেখা যাক তারা কী পরামর্শ দেন। বলা যায়, এটা একটা পরামর্শসভা।’ তিনি বলেন, ‘২৭ বছর ধরে আমরা এ দলটি করছি, এখন আমরা দলের কেউ না!’ এক প্রশ্নের জবাবে সুব্রত চৌধুরী বলেন, দলের নেতারাই করণীয় ঠিক করবেন, দল ভাঙার প্রশ্ন আসছে না।
২৬ সেপ্টেম্বরের এই বৈঠক সম্পর্কে ড. রেজা কিবরিয়া ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের বর্তমানে যে আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে, সেখানে সুব্রত চৌধুরী, মোস্তফা মহসিন মন্টু ও অধ্যাপক আবু সাইয়িদ নেই। কাজেই তাদের এ ধরনের কোনো বৈঠক ডাকারও অধিকার নেই। জানি না, তাদের উদ্দেশ্য কী। তাদের বিরুদ্ধে যদি কোনো ব্যবস্থা নিতে হয়, সেটি দলীয় ফোরামে আলোচনা করেই নেওয়া হবে।
সুব্রত চৌধুরী ও মন্টু দুজনই গণফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। কাউন্সিলের মাধ্যমে সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে বাদ পড়ার পর গত দুটি কমিটিতে সুব্রত চৌধুরী দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আর গত বছরের ২৯ এপ্রিল কাউন্সিলের পর সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে বাদ পড়েন মন্টু। এরপর মন্টুকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রাখা হলেও তিনি দলীয় রাজনীতিতে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় থাকেন। সর্বশেষ কাউন্সিলের পর গঠিত কমিটিতে অধ্যাপক আবু সাইয়িদকে নির্বাহী সভাপতির পদ দেওয়া হয়।
এদিকে রাজধানীর আরামবাগে ইডেন কমপ্লেক্সে দলের দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টিও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ড. কামাল নতুন করে পুরানা পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভাড়া নিয়েছেন। আর ছেড়ে দেওয়া কার্যালয়টি নতুন করে ভাড়া নিয়েছেন সুব্রত চৌধুরী, মন্টু ও অধ্যাপক আবু সাইয়িদরা।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে গণফোরামে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা দেয়। ঘটে পালটাপালটি বহিষ্কারের ঘটনা। সর্বশেষ গত ২ মার্চ গণফোরামের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মোশতাক আহমেদ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হেলাল উদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক লতিফুল বারী হামিম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক খান সিদ্দিকুর রহমান এবং প্রবাসীকল্যাণ সম্পাদক আবদুল হাছিব চৌধুরীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরদিন এই বহিষ্কৃত চার জন দলটির সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়া, সহসভাপতি মহসীন রশীদ ও শফিকউল্লাহ এবং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক আহমেদকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। তবে কোনো বহিষ্কারের বিজ্ঞপ্তিতেই দলের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের স্বাক্ষর ছিল না।
