মাহবুব রেজা
এক
আমাদের ছয় ভাইয়ের পর একমাত্র ছোটবোন মুন্নি।
১৯৭৮ সালে, মা আর বাবা মারা যাবার সময় ওর বয়স ছিল মাত্র সাড়ে তিন। মাথায় বাজ ভেঙে পড়ার মতো হুটহাট করে বায়ান্ন দিনের হেরফেরে বাবা-মা মারা গেলে আমাদেরকে জীবন ধারণের নিমিত্ত বিভিন্ন আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচির মতো করে।
অনেক আদরের বোনটাকে আমরা খুব একটা কাছে পাইনি।
আমাদের ছেলেবেলার সেই বিপর্যস্ত দিনগুলোতে দূরদূরান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আত্মীয়স্বজনদের বাড়ি থেকে আমরা আমাদের বোনকে খুব একটা দেখতে আসার সুযোগ করে উঠতে পারতাম না। ঈদপার্বণে কোথাও একসঙ্গে হলে উপরি পাওনা হিসেবে দেখা মিলত বোনের সঙ্গে। যখন বোনের সঙ্গে দেখা মিলত, তখন আমাদের কাছে আমাদের বোনকে মনে হতো অনেক দূরের মানুষ।
বাবা-মায়ের সংসারে ভাইবোনেদের মধ্যে যেরকম স্বাভাবিক কথাবার্তা হতো, আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে সেরকম কিছু হতো না—ছিল না। অনেকদিন পর আমাদের বোনের সঙ্গে যখন আমাদের দেখা হতো তখন আমরা শুধু আমাদের বোনের দিকে তাকিয়েই থাকতাম।
আমার মায়ের পেটের বোনকেও তখন যেন কেমন পরপর লাগত। আশ্রিত জীবন আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে তৈরি করে দিয়েছিল এক অলিখিত সমন্বয়হীনতার প্রাচীর। মন খুলে কথা বলার খুব ইচ্ছে করত কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনো কথা হতো না। হলেও অপরিচিতজনেরা যেরকম করে কথাবার্তা বলে আমরাও সেরকম করেই কথাবার্তা বলতাম।
এভাবে দেখতে দেখতে অনেক বছর পার হলো।
আমাদের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বোনটাও একদিন দেখতে দেখতে, না দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল। পড়াশোনা শেষে বিয়ে করল। দুই মেয়ে এক ছেলে নিয়ে সোনার সংসার বড় করে তুলল।
দুই
এখন মাঝে মাঝে বোন আমার বাসায় বেড়াতে এলে ওর ছেলেমেয়েগুলো সারা ঘরে খেলাধুলা করে। গান গায়। নিজেদের মধ্যে কত কথা বলে! দৌড়াদৌড়ি করে, হৈহুল্লোড় করে। ওদের আনন্দ-কলরবে আমার বাড়ির ঘরগুলো ঝলসে ওঠে। আলোকিত হয়ে ওঠে। জীবন্ত হয়ে ওঠে।
আমি তখন খুব অবাক বিস্ময়ে আমার ছোটবোনের দেবদূতের মতো ছেলেমেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি...
অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য
