পুলিশ শব্দের প্রথম ‘পি’ অক্ষরের অর্থ হইল পিস—অর্থাত্ শান্তি। শিল্পোন্নত দেশে ইহা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। কিন্তু এই উপমহাদেশের জনমানসে পুলিশ বহুকাল ধরিয়া বহু ক্ষেত্রেই মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। প্রথাগত ভীতি এইরূপ যে, বাঘে ছুঁইলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁইলে ছত্রিশ ঘা। তবে ইদানীং আমরা লক্ষ করিতেছি, আমাদের পুলিশ বাহিনী এই নেতিবাচক ভাবমূর্তি হইতে ক্রমশ বাহির হইয়া আসিতেছে। বলা যায়, বহুলাংশে পুলিশ এখন জনগণের নিকট ভরসার নাম। পুলিশের ভালো কাজের তালিকা এখন দীর্ঘ হইতেছে। এমনকি তাত্ক্ষণিক বিপদ হইতে উদ্ধারের ক্ষেত্রেও পুলিশ বিশেষ তত্পরতার পরিচয় দিতেছে। এই তো রাজধানীর উত্তরায় একটি বহুতল ভবনের পাঁচতলার জানালার সানশেড হইতে মীম নামে এক শিশু গৃহকর্মীকে উদ্ধার করিয়াছে উত্তরা পশ্চিম থানার একাধিক পুলিশ টিম ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা।
একটি সুষ্ঠু সমাজের পুলিশ উত্পীড়ক হইবে না, হইবে মানুষের বন্ধু—এমন স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষার পূরণ এক শত ভাগ আশা করিবার পূর্বে আমাদেরও ভাবিয়া দেখা উচিত পুলিশের সংকট ও সীমাবদ্ধতার দিকটিও। বহুকাল ধরিয়া অভিযোগ ছিল— পুলিশ সরকারদলীয় পেটোয়া বাহিনী। কিন্তু আমরা ইহাও দেখিয়াছি, কতিপয় রাজনীতিক নানাভাবে পুলিশকে নিজেদের ক্ষমতার অংশ হিসাবে ব্যবহার করিয়া থাকেন। এই চিত্র সকল সরকারের আমলেই দৃশ্যমান। মন্ত্রী-এমপিরা তাহাদের নির্দিষ্ট থানায় পছন্দের ওসি নিয়োগের জন্য পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করেন, তদবির করেন। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের প্রবল প্রতাপ-প্রতিপত্তির কাছে পুলিশরা অনেক ক্ষেত্রেই অসহায় থাকেন। এই অবস্থায় পুলিশ দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করিতে পারে না অনেকাংশেই। তাহা ছাড়া আরেকটি বিষয় হইল, জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশে শান্তিকালীন প্রতি চার শত মানুষের বিপরীতে এক জন পুলিশ সদস্য থাকাকে আদর্শ হিসাবে ধরা হয়। অথচ বাংলাদেশে জনসংখ্যা ও পুলিশের অনুপাত হাজারে এক জন মাত্র। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও এখন আমরা ক্রমশ জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে পুলিশের সক্ষমতার সফল কাহিনি দেখিতে পাইতেছি। বিশেষ করিয়া উগ্রবাদী তত্পরতা এবং সাইবার ক্রাইমের মতো নিত্যনূতন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও তাহারা বহু ক্ষেত্রেই দক্ষতার স্বাক্ষর রাখিয়াছেন।
একটি এলাকায় যাহারা অপরাধী কিংবা নানান ধরনের অপরাধ করিয়া থাকে, তাহাদের ব্যাপারে সর্বত্রই পুলিশ ওয়াকিবহাল। পুলিশ চাহিলেই তাহাদের নিয়ন্ত্রণ বা দমন করিতে পারে। আশার কথা, পুলিশের সেই সদিচ্ছার মাত্রা কমবেশি বাড়িতেছে নিঃসন্দেহে। সমগ্র বিশ্বেই সময়ের পরিবর্তনের সহিত পালটাইয়া গিয়াছে আন্ডারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও জঙ্গিবাদের ধরন। ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্ববহ এই দেশের অবস্থান। সেই ভয়াবহ ও অত্যাধুনিক সন্ত্রাস মোকাবিলা করিবার মতো যথোপযুক্ত ও যুগোপযোগী সক্ষমতা আমাদের পুলিশ বাহিনীর নাই—তাহা অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সহিংসতার সময়ই স্পষ্ট হইয়া যায়। এমনকি আন্ডারওয়ার্ল্ড কিছু সন্ত্রাসীও অনেক ক্ষেত্রে এমন সকল অস্ত্র ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যাহা আমাদের পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্য কখনো চোখেই দেখেন নাই। সুতরাং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সহিত পাল্লা দিয়া বাড়িয়া চলা অপরাধকে নিয়ন্ত্রণ করিতে হইলে পুলিশের জনবল, সরঞ্জাম, দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি প্রয়োজন। স্পষ্টতই, দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকারী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ পুলিশের অর্জন ও ঐতিহ্য এখন গর্ব করিবার মতোই।
