নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা
আজ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, নবাব সিরাজউদ্দৌলার ২৯৩তম শুভজন্মদিন। বীর দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজউদ্দৌলা বাংলা বিহার উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব। বিশ্বাসঘাতকতায় পলাশীর যুদ্ধে তার পরাজয়ের মাধ্যমে ভারতবর্ষে প্রায় ২০০ বছরের ইংরেজ শাসনের সূচনা হয়। সিরাজউদ্দৌলা তার নানা নবাব আলিবর্দি খানের উত্তরাধিকারী হিসেবে সাড়ে ২৮ বছর বয়সে ১৭৫৬ সালে বাংলার নবাবের আসনে বসেন। প্রধান সেনাপতি মিরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় ২৩ জুন, ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে লর্ড রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাহিনীর কাছে পরাজিত হন। ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার জন্ম ১৭২৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। তিনি ছিলেন বাংলার বীর নবাব আলিবর্দি খানের নাতি। আলিবর্দি খানের কোনো পুত্র ছিল না। তার ছিল তিন কন্যা। তিন কন্যাকেই তিনি নিজের বড় ভাই হাজি আহমদের তিন পুত্রের সঙ্গে বিয়ে দেন। নওয়াজিশ মুহাম্মদের সঙ্গে বড় মেয়ে ঘসেটি বেগমের, সাইয়েদ আহম্মদের সঙ্গে মেজো মেয়ে এবং জায়েন উদ্দিন আহমদের সঙ্গে ছোট মেয়ে আমিনা বেগমের বিয়ে দেন। আমিনা বেগমের তিন পুত্র ও দুই কন্যা। পুত্ররা হলেন মির্জা মোহাম্মদ সিরাজউদ্দৌলা, ইকরামউদ্দৌলা, মির্জা মেহেদি। আলিবর্দি খান যখন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন, তখন তার তৃতীয় কন্যা আমিনা বেগমের গর্ভে মির্জা মোহাম্মদ সিরাজউদ্দৌলার জন্ম হয়। এ কারণে তিনি সিরাজের জন্মকে সৌভাগ্যের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে আনন্দের আতিশয্যে নবজাতককে পোষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। সিরাজ তার নানার কাছে ছিলেন খুবই আদরের, যেহেতু তার কোনো পুত্র ছিল না। তিনি মাতামহের স্নেহ-ভালোবাসায় বড় হতে থাকেন। আলিবর্দি খান মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলে সিরাজ তার সঙ্গী হন। নবাব আলিবর্দি খান যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলাকে তরুণ বয়সেই পাটনার গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করেন। রাজা জানকীরামকে যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলার রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়। আলিবর্দি খান দরবারে স্নেহভাজন দৌহিত্রকে পাশে বসিয়ে ঘোষণা দেন, আমার পরে সিরাজউদ্দৌলাই বাংলা বিহার উড়িষ্যার মসনদে আরোহণ করবে। ইতিহাসে এই ঘটনাকে সিরাজউদ্দৌলার যুবরাজ হিসেবে অভিষেক বলে অবিহিত করা হয়েছে। এই সময়ে সিরাজউদ্দৌলা বয়সে তরুণ ছিলেন। সিরাজকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন করার ঘটনা তার আত্মীয়বর্গের অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। অনেকেই তার বিরোধিতা শুরু করেন। সিরাজউদ্দৌলা মসনদে বসেই প্রশাসনে বেশ কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসেন। মিরজাফরকে সেনাবাহিনীর প্রধান বখশির পদ থেকে সরিয়ে মিরমর্দ্দানকে সেখানে নিয়োগ দেন। এছাড়া মোহনলালকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত করা হয়। এরপর সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদের কলকাতায় অবস্থিত কাশিমবাজার কুঠির ব্যাপারে মনোযোগী হন। কারণ সিরাজউদ্দৌলা তাদের এদেশে কেবল বণিক ছাড়া আর কিছু ভাবেননি। এ কারণে ১৭৫৬ সালের ২৯ মে কাশিমবাজার কুঠি অবরোধ করা হয়। ফলে ইংরেজরা নবাবের হাতে যুদ্ধাস্ত্র তুলে দিয়ে মিথ্যা মুচলেকার মাধ্যমে এ যাত্রায় মুক্তি পায়। কলকাতার নাম বদল করে নবাব আলিবর্দি খানের নামানুসারে ‘আলিনগর’ রাখা হয়। এই ঘটনার পর ইংরেজরা আরো নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। তারা জগত্ শেঠের মাধ্যমে মিরজাফরকে মসনদে বসানোর চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে ফেলে। পরিকল্পনায় আরো যোগ দেন রাজা রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ, মিরন, মির কাশিম, ইয়ার লতিফ খান, ঘসেটি বেগম প্রমুখ। ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ১৭৫৭ সালের ৫ জুন মিরজাফরের একটি গোপন চুক্তি সম্পাদিত হয়, যার ফসল ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ। চুক্তি সম্পাদনের পরই রবার্ট ক্লাইভ পলাশীর প্রান্তরে সৈন্য সমাবেশ ঘটান। সিরাজউদ্দৌলাও তার সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। মিরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন। নতুন সৈন্য সংগ্রহ করে বাংলাকে উদ্ধারের জন্য নবাব সিরাজউদ্দৌলা কিছু বিশ্বস্ত অনুচর নিয়ে রাজধানীতে ফিরে যান। কিন্তু বিধি বাম, ২৯ জুন বীর দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে প্রিয়তমা সহধর্মিণী বেগম লুত্ফুন্নিসা ও একমাত্র সন্তান কন্যা উম্মে জোহরাসহ আটক করে বাংলার বেইমান বিশ্বাসঘাতকেরা। এরপর ২ জুলাই মিরজাফরের পুত্র মিরনের নির্দেশে মুহাম্মদি বেগ সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করে।
উল্লেখ্য যে, অনাথ মুহাম্মদি বেগ আলিবর্দি খানের সহধর্মিণী শরফুন্নিসার ঘরে লালিত পালিত হয়েছিলেন এবং প্রচুর ধনসম্পদ দান করে তিনি তাকে বিত্তশালী করেছিলেন। আর এভাবেই বীর দেশপ্রেমিক সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলার স্বাধীনতার সূর্যও অস্তমিত হয়। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সততা, দেশপ্রেম, আদর্শ, চেতনা, ভালোবাসা আজও বাংলার দেশপ্রেমিক প্রতিটি হূদয়কে অনুপ্রাণিত করে। তাই তো বাংলার প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের স্বপ্নের নায়ক নবাব সিরাজউদ্দৌলা। আর মিরজাফর আজও খলনায়ক বা বিশ্বাসঘাতকের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত।
n লেখক :নবাব সিরাজউদ্দৌলার ৯ম রক্তধারা প্রজন্ম
