আইএমইডির পর্যবেক্ষণ
আলাউদ্দিন চৌধুরী
পরিত্যক্ত, ঠিকানাহীন, পিতা-মাতা নেই এমন শিশুদের জন্য সরকারিভাবে পরিচালিত ১৮টি সরকারি শিশু পরিবার ও ১টি ছোটমণি নিবাসে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে শিশুরা। এর হোস্টেলগুলো বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় গণপূর্ত বিভাগ অনেক আগেই এগুলোকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। এগুলো পুনর্নির্মাণে প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও গত দুই বছরে এর কোনো অগ্রগতি নেই। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিত্যক্ত ভবনসমূহ যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। এতে জীবনহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইএমইডি পর্যবেক্ষণে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু শিশু পরিবারে মেনু অনুযায়ী খাবার দেওয়া হয় না। প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবাব দেওয়া হয়। বাবুর্চি না থাকায় শিশুদের স্কুল-কলেজে না গিয়ে রান্নায় সাহায্য করতে হয়। শিশুদের পড়াশুনা তদারকি ও মূল্যায়নের কোনো ব্যবস্থা নেই। তদারকি করার মতো দায়িত্বশীল কেউ নেই। অনেক শিশু পরিবারে শিক্ষকের স্বল্পতা রয়েছে। আবার যেখানে শিক্ষক রয়েছে তাদের সৃজনশীল পদ্ধতি বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ নেই। বেশিসংখ্যক শিশু পরিবারে খণ্ডকালীন ডাক্তার নেই। কোথাও ডাক্তার থাকলে তা খুবই অনিয়মিত। সরকারি শিশু নীতি অনুযায়ী প্রত্যেক শিশুর একটি হেলথ কার্ড তৈরি করা এবং প্রতি ১৫ দিন পরপর প্রতিটি শিশুকে সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার কথা থাকলেও বাস্তবে কিছুই করা হয় না। আইএমইডির তথ্য সংগ্রহকালে শিশুরা জানিয়েছে, কিছু হোস্টেল সুপারদের বাসায় গিয়ে কাজ করে দিলে তারা সন্তুষ্ট থাকে, কাজ না করে দিলে তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়। শিশুদের কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা খুবই সীমিত।
বর্তমানে দেশে ৮৫টি সরকারি শিশু পরিবারে এতিম ও দুস্থ শিশুদের লালনপালন করা হচ্ছে। পরিত্যক্ত, ঠিকানাহীন, এতিম, পিতা-মাতার স্নেহবঞ্চিত, প্রতিবন্ধী, পাচারকারীদের কবল হতে উদ্ধারকৃত এবং কারাগারে অবস্থানরত সমস্যাগ্রস্ত মহিলাদের শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে এসব শিশু পরিবারে। এর মধ্যে ১৮টি সরকারি শিশু পরিবার এবং একটি ছোটমণি নিবাসের শিশুদের হোস্টেল, তত্ত্বাবধায়কের বাসস্থান ও ট্রেনিং সেন্টারসমূহ বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন মেয়াদে ২৯৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘সরকারি শিশু পরিবার ও ছোটমণি নিবাস নির্মাণ/পুনর্নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি গ্রহণ করে সমাজসেবা অধিদপ্তর। প্রকল্পের আওতায় নির্মাণকাজের পাশাপাশি শিশুদের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা, জীবনমান উন্নয়ন প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আইএমইডি প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় চলতি বছরের মে মাসে ৬০০ শিশুর তথ্য সংগ্রহ করে। পাশাপাশি ১৩টি ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন (দলগত আলোচনা) করা হয়েছে। প্রাপ্ত ফলাফল সম্প্রতি প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ১৮টি শিশু পরিবার ও একটি ছোটমণি নিবাসে ২ হাজার ৬২৫ শিশু থাকার অনুমতি আছে। কিন্তু মাত্র ১ হাজার ৩০০ জন বাস করছে। নিবাসে অনেক প্রতিবন্ধীও রয়েছে।
বসবাসকারী শিশুরা জানায়, একটাই সমস্যা বিল্ডিং কখন ভেঙে পড়ে। সবসময় শিশুরা ভয়ে আছে। বাসস্থানের অবস্থা খুবই জরাজীর্ণ। আতঙ্ক নিয়ে তারা ঘুমাতে যায়। তাদের চিকিত্সার জন্য ডাক্তার রাখা হলেও ৭২ শতাংশ শিশু জানায় সরকারি শিশু পরিবারে তারা নিয়মিত চিকিত্সাসেবা পায় না। প্রতিবন্ধী শিশুদের টেককেয়ার করার মতো প্রশিক্ষিত কোনো স্টাফ নেই। শিশু পরিবারের সীমানাপ্রাচীর ভাঙা, এখানে নৈশপ্রহরীও নেই। ফলে বাইরের লোকজন ভেতরে সহজে প্রবেশ করে। সাক্ষাত্কালে অনেক শিশু জানায়, বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে মাদক গ্রহণ করে। মাঠে শিশুরা খেলাধুলা করতে পারে না। বাইরের ছেলেরা এসে বাধা দেয় ও মারধর করে।
এসব শিশু পরিবারের সংশ্লিষ্টরা আইএমইডি কর্মকর্তাদের জানান, এসব ভবনের সব কক্ষে শিশুদের রাখা সম্ভব হচ্ছে না। দুই-একটি কক্ষে গাদাগাদি করে রাখা হচ্ছে। কোনো কোনো শিশু পরিবারের মূল ভবন হতে শিশুদের সরিয়ে অন্য ভবনে রাখা হচ্ছে। আবাসন সংকটে নতুন করে শিশুদের নেওয়া হচ্ছে না। তাছাড়া জনবল সংকটে শিশুদের পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
