স্বাদ হারাচ্ছে ইলিশ!

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:১৪

আসিফুর রহমান সাগর

ইলিশ বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় মাছ। ইলিশের প্রতি বাঙালির টান এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে। দুর্গাপূজায় ভারতে উপহার হিসেবে বাংলাদেশ ইলিশ রপ্তানি করে। বাঙালির আড্ডায় একবার যদি ইলিশ প্রসঙ্গ ওঠে তবে তা আর থামতে চায় না। কোন ইলিশটা ভালো? বরিশালের ইলিশের স্বাদ কেমন? চাঁদপুরের ইলিশই কি স্বাদে সেরা? আবার প্রবীণরা বলেন, পদ্মার ইলিশের ধারেকাছে আর কেউ নেই। তবে সব আড্ডাই শেষ হয় ইলিশের ‘সেই স্বাদ আর নেই’ তে গিয়ে।

একসময়ে প্রবাদ ছিল পদ্মার নাকভাঙা ইলিশ হচ্ছে সবার সেরা। কেন নাকভাঙা ইলিশ সেরা? রসনাবিলাসীরা বলেন, যে সব ইলিশ পদ্মার পাকশীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পিলারে এসে ধাক্কা খায়। তাদের নাক যায় ভেঙে। উজানে এতদূর চলে আসার জন্য সেই ইলিশের শরীর তেলে ভরপুর হয়ে প্রায় গোল হয়ে ওঠে। সেই ইলিশের নাকি গন্ধ-স্বাদের তুলনা নেই। এ কথা ঠিক, পদ্মার ইলিশের তুলনা হয় না। তবে ডিমওয়ালা ইলিশের চেয়ে ডিম আসি-আসি করছে এমন ইলিশের স্বাদ সবচেয়ে বেশি।কথা কিন্তু একেবারেই মিথ্যা নয়। সাগরের ইলিশ ডিম ছাড়তে স্রোতের বিপরীতে মিঠাপানিতে মানে নদীতে উঠে আসে—এ কথা সবার জানা। এই মিঠাপানিতে ইলিশ যত বেশি সময় থাকবে ততই এর স্বাদ বাড়তে থাকবে। বাড়তে থাকবে সুগন্ধ। ইলিশের গন্ধের জন্যই তো রসনাবিলাসী বাঙালি পাগল!

বাংলার মানুষের রসনার ইতিহাসে ইলিশ এক আবেগের নাম। সেই আবেগ ও ভালোবাসা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এটা পরিণত হয়েছে সাংস্কৃতিক প্রতীকে। ইলিশ মাছ ভাজা তো সবার প্রিয়। ইলিশ পাতুরি, সর্ষে ইলিশের নাম শুনলে জিভে পানি আসে না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গের যে কোনো বাঙালির কাছে নিয়ে যাওয়া সবচেয়ে প্রিয় উপহারের নাম ইলিশ। অনেক বাঙালি হিন্দু পরিবার বিভিন্ন পূজার সময় বা শুভ দিনে জোড়া ইলিশ কেনেন।

হারিয়ে গেছে ইলিশের স্বাদ!

এটা ঠিক, আগের চেয়ে ইলিশের উত্পাদন বহু গুণে বেড়ে গেছে। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ইলিশের সেই স্বাদ-গন্ধ যাচ্ছে হারিয়ে। কেন এই অবস্থা? বর্তমান সময়ে সবচেয়ে স্বাদের ইলিশ মেলে চাঁদপুরে। সাগর থেকে মিঠা পানিতে স্রোত ঠেলে যে সব ইলিশের ঝাঁক চাঁদপুর পর্যন্ত পৌঁছে যায় সেই ইলিশের স্বাদই এখন সেরা। বাজারে চাঁদপুরের ইলিশের দাম সবচেয়ে বেশি। তবে চাঁদপুরের ইলিশ দেশের বাজারে খুব কমই পাওয়া যায়। বেশির ভাগই চলে যায় বিদেশে। পূজার সময় ভারতে রপ্তানি করা হয় এই ইলিশ। এ বছরও ১ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। ভারতীয় পত্রিকায় তা বেশ বড় খবর। এছাড়া ইউরোপ, আমেরিকাতেও পরিমাণে কম হলেও রপ্তানি হয় ইলিশ। ফলে দেশের মানুষের ভাগ্য হয় না চাঁদপুরের ইলিশ খাওয়ার। তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয় নদীর মোহনায় ধরা পড়া ইলিশ খেয়েই। এদিকে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণ ধীরে ধীরে ভাটির দিকেও ছড়িয়ে পড়ায় ইলিশের স্বাদ কমে আসছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নদীর ইলিশ বনাম সাগরের ইলিশ

নদীর ইলিশ সাগরের ইলিশের চেয়ে উজ্জ্বল ও চকচকে হয়। সাগরের ইলিশ কিছুটা ফিকে ও পাতলা হয়। ইলিশ নদীতে যতটা সময় কাটাবে ততই তার শরীর থেকে বাজে উপাদান ঝরতে শুরু করে। এর ফলে ইলিশের পেশি শক্ত থেকে ধীরে ধীরে নরম তুলতুলে হয়ে আসে। সেই মাছ রান্না করে মুখে দিলে একবারে তুলতুলে নরম হয়ে গলে যায়। এছাড়া নদীর ইলিশ বিশেষ করে পদ্মা-মেঘনা অববাহিকার ইলিশ মাছের আকার হয় পটলের মতো অর্থাত্ মাথা আর লেজ সরু আর পেটটা মোটা হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাগর থেকে ইলিশ যখন ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসে, মানে উজানে আসে তখন নদীর যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী খায়, তাতে তার শরীর মোটা হয়।

ইলিশ বংশবিস্তারের জন্য সর্বোচ্চ ১২০০ কিমি দূরত্ব পাড়ি দিয়ে আসে। প্রধানত বাংলাদেশের পদ্মা (গঙ্গার কিছু অংশ), মেঘনা (ব্রহ্মপুত্রের কিছু অংশ) এবং গোদাবরী নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। তবে পদ্মার ইলিশের স্বাদের কাছে অন্য কোনো এলাকার ইলিশ দাঁড়াতে পারে না। ইলিশ মাছ সাগর থেকেও ধরে, কিন্তু সাগরের ইলিশের কোনো স্বাদ হয় না। ইলিশের শরীরে তেল জমে নদীতে আসার পরেই। দৈনিক গড়ে ৭১ কিলোমিটার ছুটে চলা ইলিশ সে াতের বিপরীতে চলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আমাদের মত্স্য বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে দেশের উপকূলের প্রায় ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ‘ইলিশ প্রজননস্থল’ হিসেবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এ সময় ইলিশের দল ঝাঁকে-ঝাঁকে সাগর মোহনা হয়ে ভাটি মেঘনার ভোলা ও লক্ষ্মীপুর জেলার মধ্যবর্তী ঢালচর, মনপুরা, মৌলভীর চর ও কালির চর এলাকার ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে প্রজনন করে থাকে।

সরকারের সময়োপযোগী নীতিনির্ধারণের কারণে ইলিশের বংশবিস্তার আগের তুলনায় অনেক নির্বিঘ্ন হয়েছে। এর ফলে ইলিশ আগের চেয়ে অনেক বেশি ধরা পড়ছে। গত এক দশকে দেশে ইলিশের উত্পাদন প্রায় ৭৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি মত্স্য অধিদপ্তরের। তারা বলছেন, ইলিশ বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমাদের পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ মাছ বাড়ছে। আরো বাড়বে, যদি আমরা জাটকা ধরা বন্ধ রাখি। ডিম পাড়ার ভরা মৌসুমে যদি ইলিশ না ধরি।