বিতর্কিতরা ঢুকে পড়েছে আওয়ামী লীগের জেলা শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটিতেও। এমন তথ্য দলের হাইকমান্ডের কাছে এসেছে। যে কারণে গত বুধবার আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সভায় দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যাচাইবাছাই ছাড়া জেলা কমিটি অনুমোদন দেওয়া যাবে না। কেন্দ্র থেকে যাচাইবাছাই না করলে সুবিধাভোগী, সুযোগসন্ধানী, দুর্নীতিবাজ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের সংগঠনের তৃণমূলের নেতৃত্বে চলে আসার সুযোগ থেকে যেতে পারে। বৈঠক সূত্র ইত্তেফাককে এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেছে, রাজাকার ও তাদের পোষ্যরাসহ বিতর্কিতদের বিষয়ে সতর্ক আওয়ামী লীগ। সাংগঠনিক জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের ঐকমত্যের ভিত্তিতে জমা দেওয়া কমিটি সুক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা ও যাচাইবাছাই করতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জানা গেছে, নেতৃত্ব পেতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রভাবশালীদের দৌড়ঝাঁপ এবং স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের পোষ্যদের বাদ দিতে না পারা—এই তিন কারণে বিভিন্ন জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারছে না আওয়ামী লীগ। তিন দফায় সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও সম্মেলন হওয়া ৩১টি জেলার মধ্যে মাত্র ১৪টি পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিয়েছে। ১৭টি জেলা কমিটি জমা দিতে পারেনি। সর্বশেষ সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর। গত বুধবার গণভবনে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের বৈঠকে এই সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। সূত্র জানায়, বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘যেসব জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে শুধু নিজেদের পছন্দমতো লোক রাখবেন, যারা প্রতিদ্বন্দ্বীদের কমিটি থেকে বাদ দেবেন তাদের কমিটি অনুমোদন করা হবে না। যারা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী ছিলেন তাদেরও কমিটিতে মূল্যায়ন করতে হবে। যারা প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাদ দেবেন, দরকার হলে তাদের কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি করে দেব।’
জানা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে নেতা হতে পারলে প্রভাব বিস্তার করা যাবে—এই আশায় ভিন্ন মতের অনুসারীরা কমিটিতে স্থান পেতে চায়। পূর্ণাঙ্গ কমিটি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে এটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের পোষ্যরা মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন উপায়ে অবৈধ পথে বিপুল অর্থ বৈভবের মালিক হওয়ায় কমিটিতে স্থান পাওয়ার ব্যাপারে তাদের দৌড়ঝাঁপ লক্ষণীয়। ইতিপূর্বে জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন-ওয়ার্ড কমিটিতে বিতর্কিতরা স্থান লাভ করায় দল থেকে তাদের বের করে দেওয়া চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরা শুধু দলের পদ-পদবি লাভ করেনি, সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়েও জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের কারণে আওয়ামী লীগের প্রকৃত নেতাকর্মীরা কোণঠাসা। তারা যাতে কোনো কমিটিতে স্থান না পায় সেজন্য কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, গত ২০-২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে দলটি। তবে আওয়ামী লীগের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৪৭ জেলায় দীর্ঘদিন ধরে সম্মেলন হচ্ছে না। এই ৪৭ জেলার সম্মেলনের আগে তাদের অধীনে উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডগুলোতে সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। এজন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত আটটি টিম শিগগিরই সারাদেশ সফর করবে।
জানা গেছে, যুবলীগ ছাড়া সব সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন তাদের কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি দলীয় সভানেত্রীর কাছে জমা দিয়েছেন। যুবলীগের নতুন কমিটির নেতা হতে দেড় হাজারের বেশি জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) জমা পড়েছে। সেগুলো যাচাইবাছাই চলছে। স্বেচ্ছাসেবক লীগ ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া জমা দিয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হতে ৭০০ সিভি জমা পড়ে। তাদের মধ্যে ১১১ সদস্যের নামের একটি তালিকা দলীয় সভানেত্রীর কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় শ্রমিক লীগ ৩৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির একটি খসড়া জমা দিয়েছে। আওয়ামী মত্স্যজীবী লীগ তাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগও পূর্ণাঙ্গ কমিটি দলীয় সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে জমা দিয়েছে। এসব কমিটি শিগগিরই ঘোষণা করা হবে।
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের জেলা কমিটি গঠন নিয়ে সংশ্লিষ্ট শাখার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। মতের মিল হচ্ছে না। কোন কোন জেলা থেকে দুটি কমিটি জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তবে কেন্দ্র থেকে বলে দেওয়া হয়েছে, এক জেলায় দুটি খসড়া কমিটি গ্রহণ করা হবে না। একটি কমিটি জমা দিতে হবে।
