হেফাজতে ইসলামের আমির ও চট্টগ্রামের আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসার সদ্য পদত্যাগকারী মহাপরিচালক শাইখুল ইসলাম মাওলানা আল্লামা শাহ আহমদ শফী আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় আজগর আলী হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দেশের এই প্রবীণতম আলেমের বয়স হয়েছিল ১০৪ বছর।
দেশের কওমি শিক্ষার কিংবদন্তি ‘বড় হুজুর’ হিসাবে পরিচিত আল্লামা শফীর মৃত্যুতে দেশের সর্বস্তরের আলেম-উলামাদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। হাটহাজারী মাদ্রাসায় ছাত্র-শিক্ষকরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। মাওলানা শফী হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড আল হাইয়াতুল উলইয়ার চেয়ারম্যান ও আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত বাংলাদেশের সভাপতি ছিলেন। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে গেছেন। তার এক পুত্র আনাস মাদানী হাটহাজারী মাদ্রাসার বহিষ্কৃত সহকারী পরিচালক ও হেফাজতের প্রচার সম্পাদক। অন্য ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ চট্টগ্রামের পাখিয়ারটিলা কওমী মাদ্রাসার পরিচালক।
পারিবারিক সূত্র জনায়, রাতেই হাসপাতাল থেকে আহমদ শফীর মরদেহ জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে মরদেহ চট্টগ্রামে নেওয়া হয়। আজ শনিবার বাদ জোহর হাটহাজারী মাদ্রাসায় আল্লামা আহমদ শফীকে নামাজে জানাজা শেষে দাফন করা হবে।
আহমদ শফীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি প্রমুখ। শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, তার মৃত্যুতে দেশ একজন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদকে হারালো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকবার্তায় বলেছেন, আল্লামা শাহ আহমদ শফী ইসলামি শিক্ষার প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তিনি মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
২০১৩ সালে হেফাজত ইসলামের শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও শাপলা চত্বরে অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন আল্লামা আহমদ শফী। তার নেতৃত্বে দাবির প্রেক্ষিতে সরকার কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে এমএ (আরবি-ইসলামিক স্টাডিজ)-এর সমমান ঘোষণা করে।
আমাদের চট্টগ্রাম অফিস জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে হাটহাজারী মাদ্রাসার মুহতামিম পদ থেকে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগের পরে পরিচালনা পর্ষদ (মজলিসে শুরা কমিটি) তাকে মহাপরিচালক পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে মাদ্রাসার উপদেষ্টা (সদরে মুহতামিম) হিসেবে নিয়োগ দেয়। এর আগে ছাত্র বিক্ষোভের মুখে ৩৬ ঘন্টা অবরুদ্ধ অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়েন শাহ আহমদ শফী। মাদ্রাসার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার পর বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে গতকাল বিকালে ঢাকায় এনে আজগর আলী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি দীর্ঘদিন যাবত্ বার্ধক্যজনিত দুর্বলতার পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন।
আল্লামা আহমদ শফী চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ১৯১৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম বরকম আলী, মা মোছাম্মাত্ মেহেরুন্নেছা বেগম। ১৯৪০ সালে তিনি হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৯৫০ সালে তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় যান, সেখানে চার বছর লেখাপড়া করেন। ১৯৮৬ সালে হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক পদে যোগ দেন আহমদ শফী। এরপর টানা ৩৪ বছর ধরে তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। বাংলায় ১৩টি ও উদুর্তে নয়টি বইয়ের রচয়িতা তিনি।
