প্রফেসর ড. আবদুল খালেক
আমাদের দেশে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ করবার পর কলেজে ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার বিস্তৃতি। উচ্চশিক্ষার মানের সঙ্গে দেশের উন্নয়ন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। আমাদের দেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে। মধ্যম আয়ের দেশ গড়তে হলে অন্তত মধ্যম মানের শিক্ষা অপরিহার্য। আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার মান যে সন্তোষজনক নয়, বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে তা প্রমাণিত। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মেধা নেই, এমন কথা বলা যাবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা প্রতিযোগিতায় ভালো করছে, এমন কি উন্নত দেশের ছেলেমেয়েদেরকে প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দিচ্ছে, এমন উদাহরণের অভাব নেই। বিদেশে গিয়ে বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় ছেলেমেয়েরা যখন ভালো ফল করছে, তা থেকে আমরা বলতে পারি আমাদের উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে যতটা নেতিবাচক কথা বলা হয়, বাস্তবে বিষয়টি ততটা হতাশাব্যঞ্জক নয়। শিক্ষর মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই, তবে একথা ঠিক সরকারের আন্তরিকতা থাকলেই শিক্ষার মান উন্নত হবে, তা ঠিক নয়, শিক্ষার মান উন্নয়নের মূল দায়িত্ব শিক্ষকদের হাতে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন, তাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া দেশে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নানা স্তর আছে। প্রতিটি স্তর একে অপরের পরিপূরক। শিক্ষার মানকে উন্নত করতে হলে প্রাথমিক স্তর থেকেই তা শুরু করতে হবে। প্রাথমিক স্তরকে আমরা শিক্ষার ভিত হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। একটি ভবনের ভিত যদি শক্ত না হয়, বহুতল তৈরি করতে গেলে তা ধসে যাবে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রাথমিক স্তর থেকে শিক্ষার ভিত শক্ত করে তুলতে না পারলে উচ্চশিক্ষার মান উন্নত হবে না।
আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার মান আশানুরূপ নয়, এ সত্যটি স্বীকার করে নেওয়াই ভালো। এর মূলে রয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কতিপয় দুর্বল কলেজে অনার্স কোর্স চালু করা। প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কলেজে অনার্স কোর্স চালু রাখতে পারলে শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত পরিচর্যা করা সম্ভব হতো, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। গ্রামেগঞ্জের এমন কিছু কলেজে অনার্স খুলে দেওয়া হয়েছে, সে কলেজে না আছে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক, না আছে ভালো কোনো পাঠাগার। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের চাপে কলেজগুলোতে অনার্স খুলে দেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষার মান উন্নত করার ক্ষেত্রে এই দুর্বল কলেজগুলো বড় অন্তরায় বলে বিবেচিত হবে।
বর্তমানে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা শতাধিক। উচ্চশিক্ষার বিকাশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা আছে, তাতে দ্বিমত প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যারা উদ্যোক্তা , শিক্ষার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা কেমন, তারা কতটা শিক্ষানুরাগী, স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তারা কতটা অবদান রেখেছেন, এসব বিষয় বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা জরুরি ছিল। কোনো ধনাঢ্য ব্যবসায়ী যদি দেশে কোনো স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা না করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উদ্যোগী হন, শিক্ষার ক্ষেত্রে তার অনুরাগ বা আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। মনে হতে পারে শিক্ষা বিস্তারের জন্য নয়, ব্যবসা বিস্তারের জন্যই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজে হাত দিয়েছেন। বাংলাদেশে যারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক, পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শতকরা ৯৫ ভাগ মালিক ব্যবসায়ী। স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা না করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কেন তারা এত উত্সাহী হয়ে উঠলেন, এ বিষয়ে একটু জরিপ করে দেখা প্রয়োজন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ প্রণীত হয়েছে মূলত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠনে এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে যাতে কোনোরকম দুর্নীতি বা অনিয়ম না হয় সেই লক্ষ্যে। একই মালিককে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে ২০১০ আইনে নিরুত্সাহিত করা হয়েছে। সেভাবে কাজও চলছিল, কিন্তু সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, একই মালিক দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি লাভ করেছেন। এতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ২০১০ আইনের স্বচ্ছতা নিয়ে দেশের মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিতেই পারে। বেসরকারি মেডিক্যাল হাসপাতাল নিয়ে শাহেদ নামের এক ব্যবসায়ী কি জঘন্য প্রকৃতির কাজ করেছেন, তা দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি। শাহেদের মতো সুবিধাবাদী লোকজন যাতে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে না পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে দেশের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদদেরকে যত বেশি সম্পৃক্ত করা যাবে , উচ্চশিক্ষার জন্য ততই মঙ্গল।
উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে যোগ্য—মেধাবী শিক্ষক এবং দক্ষ প্রশাসনের কোনো বিকল্প নেই। অযোগ্য শিক্ষক এবং অদক্ষ প্রশাসক দিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। প্রশাসক বলতে আমি মূলত কলেজসমূহের অধ্যক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের উপাচার্যদের কথাই বলছি। দেশের যে সমস্ত কলেজে অনার্স বা এমএ পড়ানো হয়, সে সমস্ত কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনিয়র প্রফেসরদের মধ্য থেকে অধ্যক্ষ নিয়োগদান বাঞ্ছনীয়। কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার মতো সিনিয়র প্রফেসরের ঘাটতি আছে, পরিসংখ্যান তেমন কথা বলে না। সিনিয়র প্রফেসরদেরকে পাশ কাটিয়ে যখন জুনিয়র প্রফেসরদেরকে অধ্যক্ষ করা হবে, জটিলতা সৃষ্টি হবে সেখানে। অধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের নিশ্চয়ই একটা নীতিমালা আছে। নীতিমালা যথাযথভাবে মেনে চলতে পারলে কারো মনে কোনো প্রশ্ন বা হতাশা থাকবে না।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে উপাচার্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা শতাধিক এবং সরকারি তথা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তিনটি পদকে সাংবিধানিক পদ বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে— ১. উপাচার্য, ২. উপ-উপাচার্য, ৩. কোষাধ্যক্ষ। এরা মহামান্য চ্যান্সেলর কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন। অপ্রিয় হলেও সত্য দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলছে মহামান্য চ্যান্সেলর কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য ছাড়া। এটি ঘটছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা তথা মালিকদের স্বার্থে। মালিক পক্ষ এমন কাউকে উপাচার্য করতে চায়, ২০১০ আইনে যার উপাচার্য হওয়ার যোগ্যতা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অযোগ্যদের নাম পাঠিয়ে দিয়ে মালিক পক্ষ তাদেরকে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে থাকেন। তাদেরকে বলা হচ্ছে প্রস্তাবিত উপাচার্য। বছরের পর বছর প্রস্তাবিত উপাচার্য দ্বারা অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। চ্যান্সেলর কর্তৃক কোনো যোগ্য উপাচার্যকে নিয়ন্ত্রণ করা মালিক পক্ষের জন্য সমস্যা হবে, সে কথা ভেবেই হয়তো মালিক পক্ষ তাদের প্রস্তাবিত অযোগ্য উপাচার্য দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছেন। ২০১০ আইনে এসব উপাচার্য অবৈধ বলেই বিবেচিত হবে। উপাচার্য যদি অবৈধ হয়, সে ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কত বিঘা জমি আছে, কত বড় ভবন আছে, তা দেখার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চ্যান্সেলর কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত কি না, সে দিকে অধিক নজর দেওয়া প্রয়োজন।
সরকারি তথা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা সিনিয়র প্রফেসর, তারা প্রায় সকলেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। একজন অতি মেধাবী শিক্ষক ভালো উপাচার্য হবেন, তেমন কথা বলা যাবে না। একজন উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। কাজেই একজন সফল উপাচার্যকে পাণ্ডিত্যের সঙ্গে নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করতেই হবে। উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি প্রার্থীর নেতৃত্বের বিষয়টি দেখা অত্যন্ত জরুরি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের তেমন কোনো নীতিমালা নেই বললেই চলে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের একটি গণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ কতিপয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য রেখে গেছেন। সে অধ্যাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের নীতিমালা দেওয়া আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ ঠিকমতো মেনে চলা হচ্ছে না। বিশেষ করে অধ্যাদেশ অনুসারে উপাচার্য নিয়োগের বিষয়টি এখন প্রায় অকার্যকর। উদাহরণ হিসেবে আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করছি। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সিনেট কর্তৃক নির্বাচনের মাধ্যমে নিয়োগ হওয়ার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। আমি উপাচার্য থাকাকালীন সময়ে ১৯৯৯ সালে সিনেট নির্বাচনের মাধ্যমে উপাচার্য নিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছিলাম। তারপর দীর্ঘ ২১ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৩ সালের বঙ্গবন্ধুর দেওয়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী সিনেট নির্বাচনের মাধ্যমে আর কোনো উপাচার্য নিয়োগপ্রাপ্ত হননি।
উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে বর্তমান সরকারের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। উচ্চশিক্ষায় গবেষণাকে প্রাধান্য দিতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা কিছু হচ্ছে না এমন ঢালাও মন্তব্য করাও সমীচীন নয়। উদাহরণ স্বরূপ আমরা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করতে পারি। কৃষির ক্ষেত্রে আমাদের এত যে উন্নয়ন, জমির ফসলের এত যে উত্পাদন, সে কৃতিত্ব আমাদের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিষয়ক গবেষকদের। দেশের কোনো মানুষ আজ না খেয়ে মরছে না, এটি কম অর্জন নয়। অনুরূপভাবে আমরা চিকিত্সা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাও বলতে পারি। আমাদের হাসপাতালগুলোতে বিদেশি চিকিত্সক প্রায় নেই বললেই চলে। আমাদের দেশের চিকিত্সকরাই অতি জটিল রোগের চিকিত্সা দিচ্ছেন, অতি জটিল অপারেশন সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করছেন। আমাদের মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভালো মানের শিক্ষা না থাকলে ভালো মানের চিকিত্সা আমরা পেতাম না।
n লেখক : সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
