জান্নাতুন নিসা
সৃষ্টির বেদনায় বিশ্বজীবন বরাবরই ভাঙনের সুর তুলে পথ হেঁটেছে ইচ্ছেমতো। আর ঝড়ের আকাশের রঙিন ডানায় বিশ্বজয়ী মানুষ নিঃশব্দে ঘুরে বেড়িয়েছে মহামারির শীতল প্রেমের নিঃস্ব আলিঙ্গনে। অথচ তখনো স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষ অন্ধগলি ফালি করা তুলোর ভাঁজে ফুটে ওঠা তরুণ আকাশে খুঁজে নিয়েছে, শিউলী ভেজানো ছন্দময় ভোর। যদিও করোনার ভয়াবহতায় শুরু থেকেই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচি নিয়ে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং সমাজসেবকরা মানুষের পাশে ছিলেন। কিন্তু সেক্ষেত্রে কিছু মানুষের স্বার্থলোলুপতা আমাদের করেছে ব্যথিত। কারণ, কিছু ক্ষেত্রে পদস্থ কিংবা কর্তাব্যক্তিদের সমন্বয়ের অভাবে অনেকে এই সহায়তা পাননি।
ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের কারণে বিভিন্ন ব্যাংক এবং এনজিওর মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ সুবিধার সময় দিয়েছে সরকার। ঋণ বা বিনিয়োগগ্রহীতার ব্যবসায়ের ওপর কোভিড-১৯-এর নেতিবাচক প্রভাব সহনীয় মাত্রায় রাখার লক্ষ্যে ঋণ পরিশোধ ও শ্রেণিকরণের নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেই সঙ্গে প্রথমে জুন পর্যন্ত বহাল থাকলেও পরে চলতি বছরের অর্থাত্ ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেয় মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)। এদিকে করোনার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ শোধ না করলেও তাকে খেলাপি করা যাবে না। এক্ষেত্রে সুবিধাটি প্রথমে জুন পর্যন্ত বলবত্ ছিল। পরে ১৫ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ ‘ঋণ শ্রেণিকরণ’ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে সব তপশিলি ব্যাংকে পাঠায়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ঋণ বা বিনিয়োগের শ্রেণিমান যা ছিল, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর সময়ে ঐ ঋণ বা বিনিয়োগ তদাপেক্ষা বিরূপমানে শ্রেণিকরণ করা যাবে না। তবে, কোনো ঋণের বা বিনিয়োগের শ্রেণিমানের উন্নতি হলে তা যথাযথ নিয়মে শ্রেণিকরণ করা যাবে। খ) অনুচ্ছেদ-৩ (ক)-এ বর্ণিত নির্দেশনা পরিপালনের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি বিদ্যমান মেয়াদি (স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ ও ক্ষুদ্রঋণসহ) ঋণ বা বিনিয়োগসমূহের বিপরীতে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি হতে ৩০ সেপ্টেম্বর সময়কালে প্রদেয় কিস্তিসমূহ ডিফার্ড হিসেবে বিবেচিত হবে। এক্ষেত্রে চলতি বছরের অক্টোবর থেকে সংশ্লিষ্ট ঋণ বা বিনিয়োগের কিস্তির পরিমাণ ও সংখ্যা পুনর্নির্ধারিত হবে। পুনর্নির্ধারণকালে জানুয়ারি থে?কে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যতসংখ্যক কিস্তি প্রদেয় ছিল তার সমসংখ্যক কিস্তির সংখ্যা বাড়বে। অর্থাত্ চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের কোনো কিস্তি পরিশোধিত না হলেও ঐ কিস্তিসমূহের জন্য মেয়াদি ঋণ বা বিনিয়োগ গ্রহীতা কিস্তি খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবেন না। ১ জানুয়ারি বিদ্যমান চলমান ও তলবি ঋণ বা বিনিয়োগের মেয়াদ বা সমন্বয়ের তারিখ বিদ্যমান মেয়াদ হতে ৯ মাস বা ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ (যেটি আগে ঘটে) পর্যন্ত বাড়বে। সুবিধা চলাকালে ঋণ বা বিনিয়োগের ওপর সুদ বা মুনাফার হিসাবায়নের ক্ষেত্রে এতদসংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালা বলবত্ থাকবে। তবে, ঐ সময়ে ঋণ বা বিনিয়োগের ওপর কোনো রকম দণ্ড, সুদ বা অতিরিক্ত ফি (যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন) আরোপ করা যাবে না। কোনো গ্রাহকের সুবিধা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত না হলে পূর্বনির্ধারিত পরিশোধসূচি অনুযায়ী অথবা ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ বা বিনিয়োগের অর্থ সমন্বয় করা যাবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৯ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এরপরই অর্থাত্ ২০২০ সালের ২৩ জুন মাইক্রো ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউট একটি প্রজ্ঞাপনে জানায়, কোনো গ্রাহক স্বেচ্ছায় কিস্তি দিতে চাইলে টাকা নিতে বাধা থাকবে না। তবে এই সময় পর্যন্ত কোনো ঋণ শ্রেণিকরণ, বকেয়া বা খেলাপি দেখানো যাবে না। কোনো ঋণের শ্রেণিমান উন্নীত হলে সেটা বিদ্যমান নিয়মানুযায়ী শ্রেণিকরণ করা যাবে। সংকটকালে মাইক্রো ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউট কর্তৃক ঋণগ্রহীতাকে কিস্তি পরিশোধে বাধ্য করা যাবে না। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সরকার প্রথমে জুন মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি আদায় স্থগিত করলেও সেসময়েই অনেক এনজিও জোরপূর্বক ঋণের কিস্তি আদায় করেছে। তখন থেকেই একদিকে করোনা ভাইরাস আতঙ্ক, বেকারত্ব, ফসল নষ্ট, বন্যার ভয়াবহতা আর অন্যদিকে এনজিওর ঋণের কিস্তির টাকার বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের গ্রাম-বাংলার হাজার হাজার মানুষ। লকডাউনের সেই সময় এবং এখনো ব্যুরো বাংলাদেশ, ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, আশা, সিএসএস, জাগরণী, আরআরএফ, পল্লী প্রগতি সহায়ক সমিতি, টিএমএসএস, আরডিবি, প্রশিকা, গণ উন্নয়ন প্রচেষ্টা, রিকসহ নামি-বেনামি অনেক এনজিও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে দেদার। সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে কাকডাকা ভোরেই এসব এনজিওর শত কর্মী বিভিন্ন এলাকায় বাসা-বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কিস্তির টাকা আদায়ের জন্য বেরিয়ে পড়ছেন এবং চাপ প্রয়োগে অস্থির করে তুলছে জনজীবন।সেই সুবাদে কিস্তির টাকা নিয়ে ঋণগ্রহীতার সঙ্গে এনজিও কর্মীদের অসৌজন্যমূলক আচরণ ও ঝগড়া-বিবাদের ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে ইতিমধ্যে। হাত-পা ধরেও রেহাই পাচ্ছে না গরিব ঋণগ্রহীতা।
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় স্বপ্নচারী বাঙালি সবসময়ই বর্ণময় জীবনের খোঁজে ছুটেছে। বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে এখনো তার ব্যতিক্রম নয়। তবে দীর্ঘদিনের লকডাউন, বেকারত্ব ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডব, বন্যা, ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি—এসব মিলিয়ে নিম্ন আয়ের গ্রামের মানুষ আজ শেষ পলকের দুরন্ত চাহনীতে তাকিয়ে আছে কেবল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিকে। আর নির্মম হলেও সত্যি এটাই যে, আমাদের দেশে শত কিংবা সহস্র কোটি টাকার ঋণগ্রহীতাদের ডেকে নিয়ে নতুন করে ঋণ প্রদানের নামে তাদের আগের ঋণ মওকুফের সুযোগ থাকলেও মাত্র ৩০ হাজার টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণগ্রহীতাদের ঋণ মওকুফের কোনো সহজ নজির নেই এখন পর্যন্ত! তাই আমার নিবেদন, একজন জনগণমন নন্দিত নেতা কিংবা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে নয়, আমার নিবেদন কেবল বঙ্গবন্ধুকন্যার কাছে। দয়া করে সব ঋণদাতাদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিন, যাতে তারা অন্তত ডিসেম্বর পর্যন্ত কিস্তি আদায় বন্ধ রাখে। কিংবা সরকারি অনুদান অথবা সহযোগিতায় তাদের ঋণ প্রদান না হলেও মওকুফের সুযোগ করে দিন।
n লেখক : কথাসাহিত্যিক ও নারীনেত্রী
