রাজধানীর ক্রিসেন্ট লেকের সিগনালে ফুল বিক্রি করছেন মনিরা বেগম। তিনি বলেন, ‘একটা দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতাম, এখন চাকরি না থাকায় বাধ্য হয়ে পথে ফুল বিক্রি করতে হচ্ছে। আমার মা অসুস্থ, তাই ঘরে আর বসে থাকতে পারছি না।’
গণমাধ্যমকর্মীরাও চাকরি চলে যাওয়ায় অনলাইনে পণ্য বিক্রি করছেন। আর গৃহকর্মীদের বেশির ভাগই হয় গ্রামে চলে গেছেন নয়তো ভিক্ষাবৃত্তিতে যোগ দিয়েছেন। এভাবে পেশা বদলিয়ে শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই চলছে। মহামারিতে দেশের ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। অনেকে কাজ হারিয়ে পথে বসেছেন। দীর্ঘ সময় লকডাউন ও মহামারির প্রভাবে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তাদের। এসব শ্রেণি-পেশার মানুষ কেউ শহরে, আবার কেউ গ্রামের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছেন। আর যারা এখনো অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছেন, তারা পুরোনো পেশা বদলে নতুন পেশা বা চাকরি ছেড়ে ছোটখাটো ব্যবসায় নেমেছেন।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি বছরের ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মের সাধারণ ছুটির সময় দেশের ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আর বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক খাতে বিভিন্ন অফিসে চাকরি করেন এমন ১৩ ভাগ মানুষ করোনায় কাজ হারিয়েছেন। চাকরি আছে কিন্তু বেতন নেই এমন মানুষের সংখ্যা আরো বেশি। একইভাবে ২৫ ভাগ চাকরিজীবীরই বেতন কমে গেছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, করোনা মহামারিতে পেশাজীবীদের ওপর প্রভাব পড়েছে। শুরুতে এই প্রভাব নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর পড়লেও একসময় তা উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর গিয়ে পড়বে। অনেকেই বাঁচার তাগিদে নিজেদের পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। যারা নিম্ন আয়ের বেতনভুক্ত কর্মচারী তারা চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন কর্মীদের নিয়মিত বেতন দিতে পারছেন না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মী ছাঁটাই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য শামসুন্নাহার ভুঁইয়া বলেন, করোনায় দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমিক কর্মহীন। শ্রমিকরা খুবই দুঃসহ জীবন যাপন করছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিল্স) হিসাব বলছে, দেশে গৃহশ্রমিক ২৫ লাখের বেশি। ৪ লাখের বেশি গৃহশ্রমিক শিশু, যার ৮৩ শতাংশ মেয়ে। করোনা সংকটের মধ্যে অনেক পরিবার নিজেদের সুরক্ষার কথা ভেবে ও টাকা বাঁচাতে গৃহকর্মীকে কাজে আসতে বারণ করেছে। ফলে এ খাতে কর্মরত অনেকে বেকার হয়ে পড়ছেন।
করোনায় দীর্ঘদিন মঞ্চ অনুষ্ঠান হচ্ছে না। ফলে অনেক বাদ্যযন্ত্র শিল্পীর আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে আছে। এ অবস্থায় বিপাকে পড়েছেন রোজগারহীন সংস্কৃতিকর্মীরাও। কাজ হারিয়েছেন হোটেল-রেস্টুরেন্টের অনেক কর্মচারী। হোটেলে খাবার বিক্রি কমে যাওয়ায় এরই মধ্যে ব্যবসা বন্ধ করেছেন অনেকে।
বসুন্ধরা শপিংমল, নিউমার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনীচক ও ইস্টার্ন প্লাজাসহ প্রায় এক ডজন মার্কেটের দোকান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এরই মধ্যে তাদের বিপুলসংখ্যক কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেছেন। ভবিষ্যতে আরো কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হতে পারে। তাই সবাইকে তারা যার যার মতো করে নতুন কর্মের সংস্থান করে নেওয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছেন।
