লাদাখ সীমান্ত নিয়ে দখলদারিত্বের আদ্যোপান্ত

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৪৫

সোহেল দ্বিরেফ

লাদাখ সীমান্ত নিয়ে ভারত-চীনের মধ্যে বিরোধ নতুন কিছু নয়। এটা অনেক পুরোনো ইস্যু। গত কয়েক বছর থেকে এই সীমান্তটি নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্ক কয়েক বার উঠা-নামা করলেও ১৯৬২ সালের পর আর কখনো এত বড় সংকট তৈরি হয়নি যতটা হয়েছে চলতি বছরের গত ১৫ জুনে। ২০০৩ সাল থেকে গত ১৭ বছরে ২২ বার উভয় দেশের কূটনীতিকরা আলোচনায় বসেছেন কিন্তু গ্রহণযোগ্য কোনো সমাধান আসেনি। তাহলে নিঃসন্দেহে বোঝা যায়, সীমান্তটি উভয় দেশের কাছেই কৌশলগত কারণে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় জম্মু-কাশ্মীর-লাদাখ একত্রেই ছিল কিন্তু তা বর্তমানে পাঁচ খণ্ডে বিভক্ত! কারণ, ভারতের সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে কখনো পাকিস্তানের সংঘাত আবার কখনো লাদাখ সীমান্ত নিয়ে চীনের সঙ্গে সংঘাত এজন্য এই অঞ্চলটি আস্তে আস্তে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাচ্ছে। লাদাখ সীমান্তটি মূলত কাশ্মীর উপত্যকার পূর্বে অবস্থিত। এজন্য এই সীমান্তের কথা উঠলে সেখানে আপনাআপনি কাশ্মীরের কথাও উঠে আসে। জায়গাটা খুবই দুর্গম, এখানে আবহাওয়া বসবাসের জন্যে অনুকূলে নয় তাছাড়া বারো মাস প্রচণ্ড শীত থাকে। এজন্য দীর্ঘ সময় এখানে কেউ অবস্থান করতে পারে না।

ম্যাপ অনুযায়ী ভারত ও চীনের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মাইল সীমান্ত রয়েছে। আগে উভয় দেশের মধ্যে বিবাদের কারণ ছিল অরুণাচল নিয়ে কিন্তু এখন চীন সেটা থেকে নজর সরিয়ে লাদাখ সীমান্তে নিজেদের অবস্থান পূর্বের যে কোনো সময় থেকে জোরদার করেছে। এখন তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, ভারতকে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা। যদিও চীন এখন বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটু ব্যাকফুটে আছে করোনা ভাইরাসের কারণে। এজন্য তারা তাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ দক্ষিণ এশিয়ার দিকে দিয়েছে। তারা দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে অর্থসহায়তা দিয়ে বশে আনার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে নেপালকে কবজা করেছে, হংকং এর আন্দোলনটি কঠিন হাতে দমন করেছে, বাংলাদেশকেও পাশে টানার চেষ্টা করছে এবং মিয়ানমার ও পাকিস্তান তো বহুকাল আগে থেকেই তাদের একান্ত অনুগত! সবকিছু মিলিয়ে তারা ভারতের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ছাড়ছে।

এতদিন তো পরিস্থিতি শান্ত ছিল তাহলে হঠাত্ করে কী এমন হলো যে চীন বেপরোয়া হয়ে গেল! আসলে ভারতের কিছু কাজ চীনের একদম ভালো লাগেনি তা হলো, লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করা, গালোয়ান উপত্যকায় অবকাঠামো নির্মাণকাজ প্রসার করা এবং যোগাযোগের জন্যে নতুন করে রাস্তা তৈরি করা। এ ব্যাপারে তো অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুব্রত সাহা ডয়চে ভেলেকে যে কথাটি বলেছেন সেটাও পর্যালোচনা করলে আরো স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, ‘চীনের মনে হয়েছে তৈরিকৃত রাস্তা তাদের কাছে বিপদের কারণ। আমি এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। এই জায়গায় রাস্তা বানানো যে কী অসুবিধা তা আমি জানি। অনেক চেষ্টা করে আমরা সফল হয়েছি। এর ফলে দৌলত বেগ  ওল্ডি পর্যন্ত আমরা সহজে সেনা নিয়ে যেতে পারব। এর পূর্ব দিকেই আকসাই চীন এবং ওদের হাইওয়ে। উত্তর দিকে সাকসাম উপত্যকা যেটা পাকিস্তান বেআইনিভাবে চীনকে দিয়ে দিয়েছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেজন্যই চীন রাস্তাটা নিয়ে এতটা চিন্তিত।’ এছাড়া ভারত ওখানে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দ্রুতগতিতে কাজ করার অর্থ হলো, তাদের নিয়ন্ত্রিত অংশটি মূলত চীনের নিয়ন্ত্রিত অংশটি থেকে অপেক্ষাকৃত উঁচু ও রুক্ষ। সুতরাং চীনা সৈন্যরা খুব সহজেই তাদেরকে নজরদারিতে রাখতে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে ভারতীয় সৈন্যরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই চীনা সৈন্যরা অপারেশন শেষ করতে পারবে। এজন্য বলা যায়, ভারতীয় সৈন্যদের তুলনায় চীনা সৈন্যরা বাড়তি সুবিধা ভোগ করে। এটার সুযোগ নিয়েই তারা দখলদারিত্ব বাড়ানোর খেলায় মেতে উঠেছে। অবশ্য ভারত চাইলে এই সংঘাত বহু আগেই শেষ করে দিতে পারত যদি তারা ১৯৬০ সালে চীনের দাবিটি মেনে নিত। তারা প্রস্তাব রেখেছিল, আকসাই চীনের বিনিময়ে অরুণাচলের ওপর দাবি সরিয়ে নেবে এবং আকসাই চীনে তাদের সার্বভৌমত্ব মেনে নিলে জম্মু-কাশ্মীরে ভারতের নিয়ন্ত্রণও মেনে নেবে। কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। সেটা মেনে নিলে হয়তো এত দুশ্চিন্তায় দিন পার করতে হতো না। চীন যে কোনো মূল্যেই চাইবে গলওয়ান উপত্যকায় নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে। চীনের আগ্রাসনকে ডিফেন্স করার মতো এখনো তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি ভারতকে। এই ঘটনাটি যদি পাকিস্তানের সঙ্গে ঘটতো তাহলে জবাব দিতে হয়তো এতটা সময় নিত না কিন্তু তাদের চুপচাপ অবস্থা দেখে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, তাহলে ভারতের লৌহ মানবখ্যাত নরেন্দ্র মোদি কি পরোক্ষভাবে পরাজয় বরণ করে নিলেন নাকি সংঘাত এড়াতে শান্তির পথে হাঁটতে চাইছেন, সেটা সময়ই বলে দিবে। যদিও ভারতের মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্র বারবার বলে আসছে তারা ভারতের পাশে আছে কিন্তু ভারত আদৌ তাতে স্বস্তি পাচ্ছে না কারণ, কোনোভাবে চীনের সঙ্গে যুদ্ধটা বেধে গেলে যুক্তরাষ্ট্র কতটা এগিয়ে আসবে বা কতটা সামরিক সহায়তা দিবে সেটা নিয়েও সংশয়। এজন্য তারা আপাতত ঐ পথে হাঁটছে না। এদিকে চীন যতই লাফালাফি করুক না কেন তারাও মন থেকে চাইবে না যুদ্ধ হোক কারণ, যুদ্ধে ভারতের যতটা না ক্ষতি হবে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে চীনের। গত কয়েক বছর তারা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে যতটা অগ্রগতি করেছে সেটা ঈর্ষণীয়, এখন একটা ভুল চালে তাতে ভাটা পড়ুক এটা নিশ্চয়ই চাইবে না, এজন্য তারাও সতর্ক। সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, চীন কি ভারতের সঙ্গে লাদাখ সীমান্ত নিয়ে মধ্যস্থতা করবে নাকি নিজেদের আগ্রাসি মনোভাব বজায় রেখে দখলদারিত্বের খেলায় মেতে উঠবে? আর যদি এমনটা চলতেই থাকে তাহলে ভারতের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেলে যে কোনো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। এর ফলাফল হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ অনেকটা সংকীর্ণ হয়ে আসবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর