মনীষী

আমার বাবা

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:০৬

বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, সংগীতের সঙ্গে পরিচিত মানুষজন অনেকেই আমার বাবাকে চেনেন। তিনি শিক্ষাবিদ এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবু হেনা মোস্তফা কামাল। ছাত্রজীবনে তুখোড় ছাত্র, অসাধারণ গীতিকবি। অসাধারণ বাগ্মী এবং নীতিবান একজন মানুষ, যাঁকে কাছ থেকে যত দেখেছি ততই মুগ্ধ হয়েছি। ছোটখাটো মানুষ কিন্তু এমন তীব্র ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলেন যে অনেক রাঘববোয়াল তাঁর সামনে এসে অতি সাধারণ হয়ে যেত। যে কোনো আসরে তিনি হতেন মধ্যমণি এবং তাঁকে ঘিরে রঙিন প্রজাপতির মতো ভিড় করত ভক্ত-অনুরাগী, চেনা-অচেনা মানুষজন। তিনি আত্মভোলা, খেয়ালি ছিলেন। টাকার ব্যাপারে তাঁর বিন্দুমাত্র আকর্ষণ ছিল না। এখনো যখনই তাঁর কোনো বন্ধু, ছাত্র বা ভক্তের সঙ্গে মিলিত হই—অদ্ভুত অদ্ভুত সব গল্প শুনি তাঁর সম্পর্কে। প্রতিটি গল্পই ইন্সপায়ারিং। এক অসামান্য মানুষকে উন্মোচিত করে নতুন করে আমার চোখের সামনে নিয়ে আসে।

আশির দশকের শুরুর দিকের ঘটনা, তখন প্রফেসর ফজলুল হালিম চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। আমরা থাকি ফুলার রোডের চার তলার একটি ফ্ল্যাটে। তখন মোবাইলফোনের যুগ নয়। আমাদের বাসায় কোনো টেলিফোন ছিল না এবং টেলিফোন তখন খুব কম লোকের বাসায়ই ছিল। একদিন বাবাকে পাওয়া যাচ্ছে না, সকাল থেকে তিনি উধাও তো উধাও। এদিকে দুপুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক কায়েসউদ্দীন এসেছেন বাসায় আব্বারই আমন্ত্রণে, দুপুরে তাঁর মধ্যাহ্নভোজের দাওয়াত। কায়েস চাচা আব্বার অনুপস্থিতিতে খাবেন না। শেষমেষ আব্বার দেরি দেখে তিনি বাধ্য হয়ে খেতে বসলেন, কারণ তাঁর ট্রেন ধরতে হবে। এদিকে দুপুর, বিকেল যখন গড়িয়ে গেল, আমার আম্মা খুব ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গেলেন। কারণ বাবা সবসময়ই আমাদের অবহিত রাখতেন যে তিনি কোথায় আছেন? আমার বড় বোনকে পাঠানো হলো উপাচার্য ফজলুল হালিম চৌধুরীর বাসায়। চৌধুরী চাচা আশ্বস্ত করলেন, কোথাও আছে ফিরে আসবে; কিন্তু চাচি অতি দ্রুততার সঙ্গে পুলিশস্টেশন, হসপিটাল এবং অন্যান্য জায়গায় খোঁজ নেওয়া শুরু করলেন—কিন্তু আব্বাকে পাওয়া গেল না।

এরপর বেশ রাত করে তিনি বাসায় ফিরলেন। জানা গেল তিনি বাংলাদেশ বেতারে গিয়েছিলেন। এবং বেতারের একজন ডিরেক্টর তাঁকে দুটি ফ্লাস্ক ভর্তি চা এবং কফি এবং দুই প্যাকেট সিগারেট দিয়ে একটি ঘরে বন্ধ করে দিয়েছিলেন কাগজ-কলমসহ চারটি গান লিখে দেওয়ার জন্য। বিশেষ অনুষ্ঠানের গান। ঠিক কবি কাজী নজরুল ইসলামকে দিয়ে যেভাবে গান লেখানো হতো। চারটি গান লিখে দিয়ে অবশেষে তিনি অবমুক্ত হয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হলো সেসব গানের কোনো কপি তিনি নিজের কাছে রাখেন নাই, কখনোই রাখতেন না, যে কারণে তাঁর অনেক গান এখনো খুঁজে পাওয়া যায় না। নজরুলের মতোই বলতেন, সাগর থেকে এক ঘটি জল নিলে সাগরের কিছু আসে যায় না। এই সাগরসম মানুষটিকে ভীষণ মিস করি, ভীষণ।

বাবাকে আমার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা।