ব্যক্তিগত গাড়ি বনাম গণপরিবহন

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:২৫

একটি বিশ্বদিবস পালিত হইল গতকাল। ইহার নাম বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস। এই দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল—‘হাঁটা ও সাইকেলে ফিরি, বাসযোগ্য নগর গড়ি’। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ বা ডিটিসিএ দিবসটি পালনে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করে। এই জন্য একটি জাতীয় কমিটিও গঠিত হয়। দিবসটি উদ্যাপনকারীরা এই দিনে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করিয়া হাঁটা ও সাইকেল চালানোর প্রতি গুরুত্বারোপ করিয়াছেন। প্রশ্ন উঠিতে পারে, বিভিন্ন যানবাহন থাকিতে ব্যক্তিগত গাড়ি কী দোষ করিল? এইরূপ দিবস পালনের দার্শনিক ভিত্তি কোথায়? প্রকৃতপক্ষে মানুষের আর্থিক সংগতি ও সক্ষমতা যত বাড়িতেছে, ততই বাড়িতেছে প্রাইভেট কার বা ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা। বিষয়টি ইতিবাচক, কোনো সন্দেহ নাই। ইহা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকনির্দেশক; কিন্তু সড়ক-মহাসড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি পাইলে ইহাতে অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়। একটি জনবহুল দেশে অনেক সময় যানজট নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হইয়া দাঁড়ায়। এই যানজট মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট করে বলিয়া অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হই আমরা। এই জন্য রাস্তাঘাট প্রশস্ত করা যাইতে পারে; কিন্তু সীমিত আয়তন অথচ জনবহুল দেশে এই সমস্যার সহজ সমাধান হইল ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহনকে উত্সাহিত করা।

বাংলাদেশে ব্যক্তিগত গাড়ি নিরুত্সাহিত করা ও গণপরিবহন বাড়াইতে সরকারের পক্ষ হইতে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছিল। এই জন্য একসময় প্রতি শুক্রবার সংসদ ভবনের সামনের রাস্তা দিয়া ব্যক্তিগত যান চলাচল বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়। এখন এই উদ্যোগের কথা মানুষ ভুলিতে বসিয়াছে। বিআরটিএর হিসাব মতে, দেশে সরকারি রেজিস্ট্রেশনভুক্ত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৪৫ লক্ষ। ইহার মধ্যে প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, জিপসহ ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করে ৩৪ লক্ষ ৭০ হাজার। ইহার বাহিরে অটোরিকশা, বাস-মিনিবাস, অটোটেম্পো, ট্যাক্সি মিলাইয়া মোট গণপরিবহন চলিতেছে মাত্র সাড়ে ৫ লক্ষ। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে এই সংখ্যক গণপরিবহন পর্যাপ্ত নহে। ইহার বাহিরে অনুমোদনহীন ১১ লক্ষ ইজিবাইক এবং কমপক্ষে ৪০ লক্ষ অবৈধ নছিমন, করিমন, ভটভটি, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও প্যাডেল-রিকশা রহিয়াছে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, রাজধানী ঢাকায় তালিকাভুক্ত যানবাহনের সংখ্যা এখন ১৫ লক্ষ ৭৬ হাজারের অধিক। ইহার মধ্যে ১০ লক্ষাধিক রহিয়াছে প্রাইভেট গাড়ি। তাই এই সকল গাড়ির বদলে বৃহত্ গণপরিবহন হিসাবে কলকাতার মতো মেট্রোরেল চালু, দোতলা বাস, আর্টিকুলেটেড বাস চলাচল ও নৌপথে লঞ্চ-স্টিমারের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্ব দিতে হইবে।

বস্তুত ইউরোপে সত্তরের দশকে ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবসের সূচনা করা হয়। কেননা ইহা স্বাস্থ্যসম্মত, জ্বালানিসাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও স্বস্তিদায়ক। এই জন্য কোনো কোনো দেশে জোড়-বিজোড় (নম্বর) করিয়া ব্যক্তিগত গাড়ি নামানো, একেক এলাকায় নির্দিষ্ট দিনে গাড়ি চালানো এবং ব্যক্তিগত গাড়ি শেয়ারিংয়ের নিয়ম রহিয়াছে। বাংলাদেশে অনেক দেরিতে ২০১৬ সালে এই দিবসটি প্রথমবারের মতো পালিত হইলেও এইখানে মানুষের আয় বৃদ্ধি, সস্তায় গ্যাস পাওয়া, ট্যাক্সি ও অন্যান্য পাবলিক ট্রান্সপোর্টের অভাব ইত্যাদি কারণে বাড়িতেছে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা। তবে ব্যক্তিগত গাড়ি নিরুত্সাহিত করিতে হইলে গণপরিবহন অবশ্য সুলভ করিতে হইবে।