প্রশিক্ষণে সীমাবদ্ধতা

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:২৬

প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ, সম্মানজনক, আকর্ষণীয় বা লাভজনক পেশা হিসেবে এদেশে গড়ে ওঠেনি সরকারি কিংবা বেসরকারি খাতে। তার উল্লেখযোগ্য কারণ জ্ঞান, মেধা আর দক্ষতাকে লক্ষ্য বা উত্কর্ষ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব না দেওয়া বা উপলব্ধি না করা। অর্থব্যয়, জনবল বা সময় বাড়িয়ে কিংবা বিকল্প পন্থায় কোনোরকমে কার্য সম্পাদনের গতানুগতিক চিন্তাচেতনা মস্তিষ্কে বিরাজমান থাকলে কেউ প্রশিক্ষিত হতে আগ্রহী হবেন না আর প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে না।

বেসরকারি পর্যায়ে যেসব প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তার অধিকাংশের লক্ষ্য বৈদেশিক কর্মসংস্থান। সিলেবাস বিদেশগমন প্রত্যাশী সংস্থার চাহিদানুযায়ী প্রণয়ন করা হয়, যা দিয়ে দেশের প্রয়োজন মেটানো যায় না। প্রশিক্ষণ খাত ভুগছে বিশেষজ্ঞ, কনসালট্যান্ট, অবকাঠামো স্বল্পতায় আর সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতাহীনতায়। এ দুর্বলতা, বলা বাহুল্য সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারি, ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই। পেশা হিসেবে প্রশিক্ষণকে বেছে নেওয়ার সাহস কেউ স্বজ্ঞানে নিতে পারছেন না। প্রশিক্ষণ পেশাগত শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে না।

দেশের অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণে মনোনয়ন দেওয়া হলে এবং সেটি চাকরি স্থায়ীকরণ বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে শর্ত না হলে কেউ খুশি হন না, বিভিন্ন অজুহাতে মনোনয়ন বাতিল করতে চান। কিন্তু বৈদেশিক প্রশিক্ষণের, বিশেষ করে শিক্ষা সফর তা যে কোনো বিষয়ে, যে কোনো মেয়াদে যে কোনো সময়ে চাহিদা তুঙ্গে। এর জন্য তদবির, অনুরোধ, ধরনা দেওয়ার প্রতিযোগিতা লেগেই থাকে। এ প্রতিযোগিতা এতই বাড়াবাড়ি হয় যে কখনো বিশৃঙ্খলা, অসন্তোষ দেখা দেয়, কখনো-বা চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। কখনো-বা একই সঙ্গে একই সংস্থার বা প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মকর্তা বিদেশ প্রশিক্ষণে বা শিক্ষা সফরে থাকেন বিধায় স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হয়।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা বা প্রকল্পের বার্ষিক বাজেট লক্ষ করলে দেখা যাবে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে যে বরাদ্দ থাকে বৈদেশিক প্রশিক্ষণে/শিক্ষা সফরের বরাদ্দ থাকে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। বৈদেশিক প্রশিক্ষণের গুরুত্বকে অস্বীকার বা ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই, তবে কাকে কোন প্রশিক্ষণে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে, অর্থাত্ প্রশিক্ষণার্থী মনোনয়ন/নির্বাচন যথাযথ কি না, প্রশিক্ষণার্থীর প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করার সুযোগ আছে কি না, বা তা প্রয়োগ হচ্ছে কি না কিংবা অর্থের অপচয় অপব্যবহার হচ্ছে কি না, তা দেখা খুবই প্রয়োজন। সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ যেন কোণঠাসা বা গুরুত্বহীন হয়ে না পড়ে, অর্থের অভাবে মুখ থুবড়ে না পড়ে তাও দেখা জরুরি।

প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে পদায়িত হতে কেউ আগ্রহী থাকেন না বা পদায়ন হলে প্রসন্ন চিত্তে গ্রহণ করেন না। তবে তার বাইরে ব্যতিক্রম কিছু কর্মকর্তা আছেন বইকি। দু-এক জন প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে বদলি হতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তাদের দেওয়া হয় না। একবার জেলা প্রশাসক থেকে বদলি হয়ে একজন কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ে যোগ দিলেন। একদিন কথাচ্ছলে তিনি প্রশিক্ষণ- প্রতিষ্ঠানে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কর্মকর্তা একজন বিদগ্ধ, জ্ঞানী কর্মকর্তা, তদুপরি মাঠপ্রশাসনের অভিজ্ঞতা থাকায় তারা প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে পদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করলাম, তিনি নিজেও অনুরোধ জানালেন কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু তার পদায়ন হলো না প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে, বরং একটি সরকারি গণমাধ্যম থেকে একজন কর্মকর্তাকে ঐ প্রতিষ্ঠানে পদায়ন করা হলো। যদিও বেশ কিছুদিন পর ঐ কর্মকর্তাকে কোনো এক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে পদায়ন করা হয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে এদেশে সরকারি এবং বেসরকারি খাতে কতটি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠান আছে, কোন ধরনের কতটি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠান আছে, কোন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, কোন বিষয়ে কত জন প্রশিক্ষক আছে, প্রতি বছর কোন বিষয়ে কতজন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন, প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ও দক্ষতা কার্যক্ষেত্রে কতটুকু প্রভাব ফেলছে কিংবা প্রশিক্ষণ সেক্টরের বিরাজমান সমস্যাবলিসংক্রান্ত কোনো জরিপ বা শুমারি দেশব্যাপী বা জাতীয় পর্যায়ে হয়নি। স্বাধীনতার পর প্রায় পঞ্চাশ বছর অতিবাহিত হয়েছে, প্রশিক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অদ্যাবধি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কোন ধরনের জরিপ বা শুমারি করার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেনি। অথচ মেধাভিত্তিক বা জ্ঞানভিত্তিক সমাজে এজাতীয় জরিপ বা পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অনুভূত হওয়ার প্রয়োজন ছিল। 

প্রশিক্ষণ সেক্টরে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর ট্রেইনিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিএসটিডি) একটি অলাভজনক, বেসরকারি পেশাজীবী জাতীয় সংগঠন। জানা যায় সংগঠনটি দেশব্যাপী প্রশিক্ষণের ওপর একটি জরিপ পরিচালনার জন্য পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিসংখান ব্যুরোকে (বিবিএস) অনুরোধ জানায়। আশা করা যায়, বিবিএস এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। চাকরিতে যোগদানের পর আবশ্যকীয় বুনিয়াদি বা বিভাগীয় প্রশিক্ষণের ফলাফলকে কর্মকর্তাদের পারস্পরিক মেধাতালিকা প্রস্তুতকরণে গুরুত্ব দেওয়ার বা বিবেচনায় নেওয়ার দাবি উপেক্ষিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন যাবত্ মূলত প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানগুলোর অক্ষমতা আর কোনো কোনো কর্তৃপক্ষের বিরোধিতার কারণে। ফলে প্রশিক্ষণার্থী তথা কর্মকর্তা কিংবা তার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কারো কাছেই প্রশিক্ষণ গুরুত্ব পাচ্ছে না।

প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে এবং অধীন সংস্থাসমূহকে এমনকি মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোতে ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় প্রত্যেকের বার্ষিক গড়ে ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণের বিধান চালু করা হয় ২০০৭ সালে। সব ক্ষেত্রে এ প্রশিক্ষণটি গুরুত্ব সহকারে আয়োজন করা হয় না, দায়সারা গোছের প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হয়। এমনও অভিজ্ঞতা আছে যে প্রশিক্ষণ কোর্স শুরু করে যুক্তিসংগত কারণ ব্যতিরেকে মাঝপথে বিরতি দিয়ে রাখা হয়েছে বা এমনকি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণের প্রতি সহজাত অবহেলা ছাড়াও তুলনামূলক স্বল্প বাজেট বরাদ্দও একটি কারণ বলে অনেকে মনে করেন। ইনহাউজ ব্যবস্থাপনার বিধান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে কোর্স আয়োজন করা হয়, ফলে একদিকে ঐ অফিসের প্রশিক্ষণ প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় না অন্যদিকে স্থায়ী প্রশিক্ষণকাঠামো গড়ে ওঠে না।

একটু দৃষ্টিপাত করা যাক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভৌত অবকাঠামো এবং ভৌত পরিবেশের দিকে। এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে প্রশিক্ষণের জন্য যথাযথ পরিবেশ দরকার। ভৌত অবকাঠামো থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানটির ভৌগোলিক অবস্থান পর্যন্ত সবকিছুই এ পরিবেশের অনুষঙ্গ। কনসেনট্রেশন বা মনোযোগ ব্যতিরেকে কার্যকর প্রশিক্ষণ অসম্ভব। সেজন্য নির্জন নিরিবিলি পরিবেশ, কর্মস্থল থেকে আলাদা স্থানে আবাসিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা প্রয়োজন।

প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানগুলোতে লজিস্টিক সুযোগ-সুবিধা আশানুরূপ নয়। খেলাধুলার বা শরীরচর্চার উপকরণ দু-একটি বাদে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নেই। খেলার মাঠ, সুইমিংপুল, জিমনেসিয়াম, ইনডোর গেইম রুম ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না। কোনো কোনো প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনাকালে গাড়ি চালানো শেখানোর ব্যবস্থা নেই। বাধ্য হয়ে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মাঠ, অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহূত রাস্তায় সান্ধ্য বা নৈশকালীন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়।

প্রশিক্ষণ-সফলতার পূর্বশর্ত আবাসিক ব্যবস্থা। অন্যথায় কনসেনট্রেশন বিঘ্নিত হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে আবাসিক ব্যবস্থা নেই, কোথাও কোথাও তা থাকলেও অপ্রতুল। মানসম্মত আবাসিক ব্যবস্থা নেই অনেক প্রতিষ্ঠানে। প্রশিক্ষণে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ বা মনিটরিং প্রয়োজন। তাই প্রশিক্ষকদের দাপ্তরিক বা আবাসিক অবস্থান এরূপ হওয়া প্রয়োজন যাতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বা প্রশিক্ষণার্থীদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। আবাসিক প্রশিক্ষণে শারীরিক কসরত, খেলাধুলা, জিমনেসিয়াম এবং বিনোদনের মাধ্যম থাকা অত্যাবশ্যক যা অনেক প্রতিষ্ঠানের নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান আবার এসবের আদৌ প্রয়োজন আছে বলে মনে করে না এবং গতানুগতিক ভাবেই চালিয়ে যেতে আগ্রহী।

সেশন হলের আয়তন বা বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ উপকরণ সঠিকভাবে সেশন পরিচালনার এবং প্রশিক্ষণার্থীদের মনোযোগ স্থাপনের পূর্বশর্ত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ব্যাক-লগ কমানোর জন্য ধারণক্ষমতার অনেক বেশি প্রশিক্ষণার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়। এতে একদিকে প্রশিক্ষণার্থীদের বসার সমস্যা হয়, মনোযোগ বিঘ্নিত হয় অন্যদিকে প্রশিক্ষকের পক্ষে প্রশিক্ষণার্থীদের সবার সঙ্গে ইন্টারেকশন করা বা ‘আই কন্ট্রাক্ট’ করা সম্ভব হয় না। দলীয় কাজ করার জন্য আলাদা কক্ষ বা সিন্ডিকেট-কক্ষের ব্যবস্থা অনেক প্রতিষ্ঠানেই নেই। সত্যিই বলতে কি, অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ বা প্রশিক্ষক এসবের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না কারণ তারা অভ্যস্ত লেকচার পদ্ধতির প্রশিক্ষণ মেথডে। দু-একটি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোর্স ব্যবস্থাপনা টিমের জন্য আলাদা কক্ষ বা স্থান থাকে না। সুষ্ঠুভাবে কোর্স পরিচালনার জন্য নিবিড় যোগাযোগ ও তদারকির প্রয়োজন হয় বিধায় এটি অতীব জরুরি।

সেশন হলে সবাক সিসিটিভি স্থাপন করার পক্ষে-বিপক্ষে অনেকে বিভিন্ন রকম যুক্তি উত্থাপন করেন এবং সে কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্বাক সিসিটিভি দেখা যায়। ফলে মনিটরিং কর্মকর্তা বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কেবল সেশন কক্ষের ছবিই দেখতে পান। প্রশিক্ষণ কার্যকলাপ কোনো গোপনীয় বিষয় নয় বরং যতই স্বচ্ছ হবে ততই এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে। প্রশিক্ষকের বক্তব্য, আচরণ, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, প্রশিক্ষণার্থীদের আচরণ, প্রশিক্ষককে সহযোগিতা ইত্যাদি পর্যবেক্ষণের জন্য এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে। কখনো কখনো সেশন পরিচালনার সময় কোর্স ব্যবস্থাপনা, অনুষদ সদস্যদের কেউ কেউ সেশন হলে বসে সেশন পরিচালনা পর্যবেক্ষণ করেন. যা খুবই কার্যকরী। প্রশিক্ষক মনঃক্ষুণ্ন্ন হতে পারেন সে কারণে কিংবা অনুষদবর্গের স্বল্পতার কারণে সেটির প্রচলন এখন আর নেই বললেই চলে।

n  লেখক: সাবেক সচিব