ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক ঐশ্বরিক সৌন্দর্য নিয়ে অপেক্ষায় আছে হাওরের জীবন। হাওর সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়, হাওর হলো সাগরসদৃশ পানির বিস্তৃত প্রান্তর। প্রচলিত অর্থে হাওর হলো বন্যা-প্রতিরোধের জন্য নদীতীরে নির্মিত মাটির বাঁধের মধ্যে প্রায় গোলাকৃতি নিম্নভূমি বা জলাভূমি।
তবে হাওর সব সময় নদীতীরবর্তী নির্মিত বাঁধের মধ্যে না-ও থাকতে পারে। হাওরের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতি বছরই মৌসুমি বর্ষায় বা স্বাভাবিক বন্যায় হাওর প্লাবিত হয়, বছরের কয়েক মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে এবং বর্ষা শেষে হাওরের গভীরে পানিতে নিমজ্জিত কিছু স্থায়ী বিল জেগে ওঠে। গ্রীষ্মকালে হাওরকে সাধারণত বিশাল মাঠের মতো মনে হয়।
হঠাত্ সিদ্ধান্ত নিলাম—হাওর দেখতে যাব। বড় ভাইয়ের কাজের সুবাদে ভ্রমণটা সহজ হয়ে গেল।
কিশোরগঞ্জ জেলার চারটি উপজেলা নিকলী, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও ইটনার প্রায় সবটুকুই হাওরাঞ্চল। বর্ষাকালে হাওরাঞ্চল পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। বর্ষা শেষে ধীরে ধীরে পানি কমতে শুরু করে। হাওরের বুকে যোগাযোগের জন্য নির্মিত সাবমার্সেবল রাস্তাগুলো তখন ভেসে ওঠে।
একসময় বর্ষাকালে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল নৌকা আর শুকনো সময়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হেঁটে যাওয়াই ভরসা ছিল; কিন্তু এখন দিন বদলে গেছে। উপজেলাগুলোর মধ্যে যোগাযোগের জন্য অল ওয়েদার রোড ও সাবমার্সেবল রোড তৈরি হয়েছে। শুকনোকালে আর পায়ে হেঁটে যেতে হয় না।
বাঙালি ভ্রমণবিলাসী তাই বর্ষায় হাওর ভ্রমণ খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। চারপাশের সমুদ্রসমান জলরাশির মেলা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে কিশোরগঞ্জ হাওরাঞ্চলে। নিকলী বেড়িবাঁধ, করিমগঞ্জের বালিখোলা ও অষ্টগ্রামে প্রচুর মানুষ ঘুরতে আসে বর্ষাকালে রূপসি বাংলার আরেক রূপ দেখতে।
মিঠামইনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হওয়ার পর দুই পাশের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। একেকটি গ্রাম যেন দ্বীপের মতো ভেসে আছে পানির বুক চিড়ে। প্রত্যেকটা গ্রামেই দেখা যায় তাদের সাধারণ জীবনযাপনের দৃশ্যপট। কেউ কেউ মাছ ধরছে, কেউ বা তাদের জীবিকার তাগিদে খামারের দেখাশোনা করছে। চলন্ত বোটে বসে এক চলন্ত অতি সাধারণ জীবনযাপনের চিত্র ছবির মতো ভেসে উঠেছে।
মিঠামইনে নামার পর আগে থেকেই পরিচিত জন থাকার কারণে ভ্রমণটা সহজ হলো। (ফুল মিয়া) যিনি কিনা সার্বক্ষণিক আমাদের সঙ্গে ছিলেন। সেখানকার মানুষের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হলাম।
এরপর সেখান থেকে রওনা হলাম রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ঢাকী রোড, সাবাসপুরের উদ্দেশে। সেখানে যাওয়ার পর যা দেখলাম তা আসলে কেউ না দেখলে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। চারপাশে বিপুল জলরাশি, মধ্যখানে রাস্তা চৌরাস্তাতে দাঁড়ানোর পর সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি যে কতটা সুন্দর হয় তা না দেখলে বিশ্বাস করানো যাবে না।
রৌদ্র ঝলমল পরিবেশে প্রায় আধাঘণ্টা থাকার পর (ফুল মিয়া) হঠাত্ করেই বলে উঠলেন—শহরে ফিরে যেতে হবে, ঝড় শুরু হবে। আমাদের অবাক করে দিয়ে সত্যিই তার মিনিট দশেক যেতেই ঝড়ের তাণ্ডবলীলা শুরু হলো। গাড়ি যেন এগোতে পারছিল না, সে কী ভয়ানক রূপ তার। বারবার বাতাসের বেগ যেন ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে—এমন অবস্থা।
গাড়ি থামিয়ে পাশেই এক বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। ফুল মিয়া বললেন, এক ঘণ্টা পর আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে; সত্যিই তা হলো। ঝড় থামার পর আবারও আমাদের চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে গেল প্রকৃতির অপরূপ রূপ দেখতে। তার পরের দৃশ্যপট ছিল আরো মনোরম, আকর্ষণীয় ও নান্দনিক দৃশ্যে ভরপুর। যেন প্রকৃতি স্নান সেরে এলেন মাত্রই। কতরূপে যে সাজতে পারে প্রকৃতি তার জলন্ত প্রমাণ আবারও পেলাম এখানে এসে।
বর্ষায় চারপাশে যেমন পানি থইথই করে, পানি নেমে গেলে সেই জায়গায় ধানের সবুজ রাজ্যে কিংবা ধান পেকে গেলে সোনালি রাজ্যে পরিণত হয় শুনেছি। তবে সেই দৃশ্যও দেখার ইচ্ছে মনের মধ্যে রেখে দিয়েছি। যদি সুযোগ হয় তাহলে আবারও যাব সেই রং বদলের রাজ্যে।
সেখান থেকে কামালপুরে ফিরে এসে রাষ্ট্রপতির বাড়ি দেখতে গেলাম। সেখানে রাষ্ট্রপতির বোনের (আছিয়া আলম) সঙ্গে দেখা হলো, কথা হলো, তাদের অমায়িক ব্যবহার দেখে আবারও মুগ্ধ হলাম।
ফিরে আসার সময় গোধূলি বেলায় হাওরকে এক রহস্যময় কাব্যিকতায় ভরপুর সৌন্দর্যরূপে সেজে থাকা পরিপূর্ণ গর্বিত বাংলার মাতাল করা রূপের রানির মতো মনে হচ্ছিল। মনে মনে বললাম, হে প্রকৃতি, আমরা তোমার প্রেমে পড়েছি। তোমাকে ভুলব না। তোমার রূপের টানে আবারও আসব তোমার রূপে অবগাহন করতে। জীবনানন্দের রূপসি বাংলার রূপ দেখতে। কবি জীবনানন্দের রূপসি বাংলা, রূপের যে তার নেইকো শেষ। সেই তো আমার বাংলাদেশ।
n লেখক :সাবেক শিক্ষার্থী,
নোয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজ
